প্রতিনিয়ত ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জানতে পারছি। রেললাইনে কানে হেডফোন দিয়ে চলা, রেললাইনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা, দ্রুতগতিতে রেলক্রসিং পার হওয়া কিংবা নিজে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা এসব মৃত্যুর কারণ।

রেলওয়ে আইন-১৮৯০ অনুযায়ী, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুটের মধ্য দিয়ে মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল ঢুকে পড়লে তা নিলামে বিক্রি করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষকে। এখানে সার্বক্ষণিক ১৪৪ ধারা জারি থাকে। এ কারণে রেলে কাটা পড়ে মৃত্যু হলে উল্টো ওই ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়। কিন্তু রেলওয়ে নিয়ে এমন কঠোর আইনের কথা দেশের কতজন মানুষ জানেন? এই আইনের কথা অনেকে জানেন না বলে রেললাইন ও রেলসংক্রান্ত স্থাপনাগুলো নির্বিবাদে ব্যবহার করেন! আবার রেলওয়ে নিয়ে যে আইন আছে তা রেল কর্তৃপক্ষও সেভাবে প্রচার করে না। একই সাথে এই আইন প্রয়োগেও গাফিলতি রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রেল আইনের প্রচার ও প্রয়োগ না থাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে কি না?

রেলওয়ে পুলিশের বরাতে একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে অসতর্ক ও অসচেতনভাবে রেললাইন ব্যবহারে ৯ হাজার ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরে মৃত্যু বেড়েছে তিন হাজার ১৪০ জনের, অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্বেগজনক হলোÑ সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। রেলওয়ের তথ্য মতে, ২০২১-২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে ঢাকা জেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন এক হাজার ৭৬৩ জন। এ সময় সারা দেশে মারা গেছেন তিন হাজার ৯১৮ জন। অর্থাৎ ঢাকা জেলায় মারা গেছেন এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। রেলওয়ের ঢাকা জেলার মধ্যে পড়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ।

পুলিশকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রেললাইন সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ। এর মধ্যে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় রেললাইনে একটি বাঁক রয়েছে। এতে এক পাশ থেকে ট্রেন এলে অন্য পাশে দেখা যায় না। ওই বাঁক দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করলেও কোনো পথচারী-সেতু নেই। ঝুঁকিপূর্ণভাবে দিনভর মানুষ যাতায়াত করেন। এখানে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়।’

ঢাকা শহরের কিছু এলাকায় রেললাইনের ওপর নিয়মিত বাজার বসছে। বিশেষ করে কারওয়ান বাজার এলাকার মতো জায়গায় যেভাবে রেললাইনের উপর প্রতিদিন বাজার বসে তা খুব ভয়ঙ্কর। দুর্ঘনা ঘটার জন্য এমন পরিবেশ যথেষ্ট! দুর্ঘটনাপ্রবণ এমন পরিবেশ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেবে কে?

ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যু নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়কে গভীরভাবে ভাবতে হবে। ঢাকার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আগে প্রয়োজন জনসচেতনতা বাড়ানো। দেশের রেলস্টেশন এবং রেললাইন ঘিরে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। কারণ, কোনো অপমৃত্যু কারো কাম্য হতে পারে না। সঙ্গতকারণে সরকার ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাগুলো কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।