আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হলো আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। প্রতিটি অঙ্গের কার্যপ্রণালী সংবিধানে সুনির্দিষ্ট। শাসনতন্ত্রের সীমারেখায় এগুলো কার্যসম্পাদন করলে গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণত সঙ্কট হয় না। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেমন- যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। উল্লিখিত বিভাগগুলো নিয়মমাফিক পরিচালিত হওয়ায় দেশ দু’টি শাসনতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত। ফলে গণতন্ত্র টেকসই রূপ পেয়েছে।

গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশের উদ্ভব। সেই আলোকে স্বাধীনতা-উত্তর শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। কিন্তু ৫৪ বছরেও এ দেশে যথাযথভাবে সংবিধান মেনে চলার নজির স্থাপিত হয়নি। যিনিই ক্ষমতায় এসেছেন, তিনি তার সুবিধা মতো সংবিধান লঙ্ঘন অথবা পরিবর্তনে সচেষ্ট ছিলেন। পরিণতিতে আমাদের গণতন্ত্র এখনো নাজুক।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিক জনআকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে হাজির। এই চাওয়ার অন্যতম দিক বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা। যাতে মানুষ নির্বাহী বিভাগের জুলুমের শিকার হয়ে প্রতিকার পেতে আদালতে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্যে দীর্ঘদিন বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আনার জনদাবি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। সরকার গত সোমবার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫’ এর গেজেট প্রকাশ করেছে, যা কার্যকর হলে অধঃস্তন আদালত থেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত পুরো বিচার প্রশাসন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগ থেকে প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ।

এই অধ্যাদেশ শুধু নতুন একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠনের রূপরেখা। সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে অধঃস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করে। বাস্তবে বিচারপ্রশাসন, নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাবিধির অনেক অংশ বহু বছর ধরে নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে।

২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আপিল বিভাগের ৭৯/১৯৯৯ সিভিল রায় বাস্তবায়নের আংশিক অগ্রগতি হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন, যা বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক স্বাধীনতার পূর্ণ রূপ দিতে অপরিহার্য তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালের এ অধ্যাদেশ সেই দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক বৈসাদৃশ্য দূর করবে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সচিবালয়ের ক্ষমতার আওতায় থাকবে- অধস্তন আদালতের প্রতিষ্ঠা, বিলোপ, এখতিয়ার নির্ধারণ : দেশের নিম্ন আদালতগুলোর গঠন, কাঠামো, প্রয়োজনীয় পদসংখ্যা, নতুন আদালত স্থাপন কিংবা পুরনো আদালতের পুনর্গঠন- সব সিদ্ধান্ত এখন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মাধ্যমে হবে। এ ছাড়া জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হবে সচিবালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। নির্বাহী-আবদ্ধ নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাবিধি বহু বছর ধরে বিচার বিভাগের অন্যতম দুর্বল জায়গা। নতুন কাঠামো এ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নেবে। এটি বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাবে। একইভাবে একক প্রশাসনিক কাঠামো জুডিশিয়াল সার্ভিসে লবিংনির্ভর বদলি, নিয়োগ বা ভোগদখল বিষয়ক অস্বচ্ছতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।

ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে বিচার বিভাগ নিজস্ব সচিবালয় পরিচালনা করে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সেই কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যা বিদেশী বিনিয়োগ, বাণিজ্য, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দেবে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। এটি যদি সময়মতো, স্বচ্ছভাবে ও সুপ্রিম কোর্ট-সরকার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিচার বিভাগ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত, প্রশাসনিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঠামো পেতে পারে।