নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সরকার গঠনের পর সেই কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চার বছরে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনতে কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এই কাজে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ কেন্দ্র করে এ বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। সারা দেশের প্রকাশিত নিয়োগ তালিকা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, সরকারদলীয় কর্মীরা স্থান করে নিয়েছেন তালিকায়। এর সাথে আছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ কর্মী পদধারীদের নামও। নিয়োগ কেন্দ্র করে হচ্ছে দলাদলি ও সহিংসতার ঘটনাও।

ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে যাবে কি না, সেটি নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ওপর। এসব তথ্য যারা সংগ্রহ করবেন, তাদের মধ্যে যোগ্যতা ও সততা এই দু’টি বিষয়ই থাকা জরুরি। কিন্তু এই কাজের শুরুতেই বিধিমোতাবেক মূল্যায়ন না হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ ঘিরে চলছে প্রভাব বিস্তার। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের অনেকে প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও হামলা করা হচ্ছে। এতে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম হচ্ছে।

গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগের ফল কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা করা হচ্ছে। ভাঙচুর করা হচ্ছে। সরকারি অফিসে তালাও ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমনকি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

নাটোরের বাগাতিপাড়া, গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলা, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল কিংবা কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়া তাদের ‘পছন্দ’ না হওয়ায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কক্ষ ঘেরাও করা হয়েছে। তাদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। অনেক এলাকায় আটকে আছে নিয়োগের ফল প্রকাশ।

মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানি ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। কাকে ইমাম করা হবে, কাকে মুয়াজ্জিন করা হবে, এই পছন্দ-অপছন্দের কাজটি করছেন প্রভাবশালীরা। মসজিদে নিয়োগ ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়। এ বিষয়েও বলপ্রয়োগ ও প্রভাব খাটানো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়।

এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। কর্মকর্তারা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। কোনো দলের মনঃপূত না হলেই সরকারি দফতরে হামলা ও কর্মকর্তাদের বদলি বা অপসারণের দাবি তোলার অপসংস্কৃতি টিকে থাকলে সরকারি কাজ চালানো কঠিন হয়ে যাবে। এসব বিষয়ে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে নীতিনির্ধারকদের।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো বড় একটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিত্তি কখনোই দলীয় পরিচয়, তদবির বা পেশিশক্তির ওপর নির্ধারণ হতে পারে না। এখানে একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত প্রার্থীর মেধা, দক্ষতা ও মেধা তালিকার স্বচ্ছতা। নিয়োগ-সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়মের তদন্ত নিয়ম মেনেই হতে হবে। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার সমাধান সহিংসতা বা ইউএনও অফিস ভাঙচুর করা নয়। আমরা মনে করি, এসব সহিংস ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এই উদ্যোগ যেন দলীয় সঙ্কীর্ণতায় বানচাল না হয়ে যায়।