বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে- ‘ভূমি অফিসে চাকরি পাওয়া মানে রাজা হয়ে যাওয়া।’ ভূমি অফিসের অফিস সহকারী, কর্মকর্তা- অনেকেরই রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার উদাহরণ আছে। আগে ভূমি অফিসের বারান্দায় দালালদের ঘুরঘুর করতে দেখা যেত। তাদের সাথে যোগসাজশ থাকত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। দালালদের দৌরাত্ম্য কমানোর জন্য ভূমিসেবা কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। আশা করা হয়েছিল, এতে দুর্নীতি বন্ধ হবে। কিন্তু ভূমি অফিসের চাকুরেরা আগে যেমন ‘রাজা’ হতেন, এখনো তেমনি হচ্ছেন। কেবল ‘রাজত্ব’ চালানোর কৌশল বদলেছে। এখন তারা তথাকথিত ‘ডিজিটাল এজেন্ট’ নিয়োগ করেছেন। এই এজেন্ট তথা দালালরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, অনলাইন আবেদন জমা দেয়ার পর ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ না দিলে অযৌক্তিক কারণে আবেদন বাতিল করে দেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে সার্ভার সমস্যার অজুহাত দিয়ে কাজে বিলম্ব করছে। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে দালালদের অথবা ডিজিটাল সেন্টারের আশ্রয় নেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ই-সেবা কেন্দ্রগুলোই কর্মকর্তাদের দালালি সিন্ডিকেটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জরিপ বলছে, ভূমিসেবা নিতে গিয়ে ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হচ্ছে, যা দেশের অন্যান্য সব সেবা খাতের তুলনায় বেশি। তিন বছর আগে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ।
ই-নামজারি বা অনলাইন সেবার মতো প্রযুক্তিগত সমাধান আসার পর প্রত্যাশা ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। কিন্তু টেকনিক্যাল জটিলতার অজুহাত, অন্যায্য নথির চাহিদা এবং অমূলক সার্ভার বিভ্রাটের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে সেই দালাল সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট বাজারের দোকানেই পাঠানো হচ্ছে। ভূমি অফিসের সরকারি ল্যাপটপ বা আইডি ব্যবহার হচ্ছে বাইরের দোকানে- যা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মই নয়, নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। সেবা পাওয়ার সহজ উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হচ্ছে মানুষকে। তাছাড়া এটিকে ডিজিটাল পরিষেবা বলা হলেও এর ৯৫ শতাংশ আবেদনই এখনো প্রথাগত কাগজ-নির্ভর। এগুলো সিন্ডিকেটের হাত ধরে প্রসেস হয়। সেখানে কেবল সফটওয়্যার দিয়ে কিংবা কাগজে-কলমে নির্দেশ জারি করে কি দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব? অনেকেই মনে করছেন, দুর্নীতির এই ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবেই টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের ৪৭ লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে আদালতে। এর বড় কারণ হলো ভূমি অফিসের অনিয়ম। ‘স্মার্ট সেবা’র মোড়কে এই আধুনিক দুর্নীতি থেকে ভূমি খাতকে রক্ষা করা জরুরি।
সেবা সহজ করার মাধ্যম হলো প্রযুক্তি। কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ করতে নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা প্রয়োজন। শুধু ই-সেবা চালু করেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের কাজের ওপর কঠোর ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কারণ ছাড়া সেবা না দিলে বা বারবার অযৌক্তিক কারণে আবেদন বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।