গুম কমিশনের প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট বোঝা যায়, বিগত সরকার বিরোধীদের ঠাণ্ডামাথায় গুম করেছে। একটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আওতায় কাঠামোগতভাবে এটি হয়েছে। দেশের সব বাহিনীকে মানবতাবিরোধী এই জঘন্য কাজে ব্যবহার করায় এর ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল। বাংলাদেশকে একটি মানবিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে হলে এর সুষ্ঠু প্রতিকার পেতে হবে। একদিকে প্রতিটি গুমের বিচার হতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধের যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা রোধের নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর গুম তদন্তে কমিশন গঠন হলেও এর অগ্রগতি ধীরে চলছে। তবে কমিশনকে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মধ্যে অগ্রসর হতে হচ্ছে। অবিচারের শিকার মানুষ ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করছেন কখন তাদের বিরুদ্ধে হওয়া গুরুতর অন্যায়ের বিচার পাবেন।
গুম কমিশন বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানিয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিযুক্ত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা-ডিজিএফআই ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা-এনএসআইয়ে কর্মরত অনেককে গুমের সাথে জড়িত করা হয়েছিল। এগুলোতে দায়িত্বরত সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা সরকারের উপরের নির্দেশে সমন্বিতভাবে জনগণের নিরাপত্তা হরণ করেন। এ জন্য সরাসরি বাহিনীগুলোকে দায়ী করা না গেলেও এই অপকর্মে নাগরিকদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। একই সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার সহযোগিতার বিষয়টিও জোরালো হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কিছু ব্যত্যয় ঘটার নজির ইতোমধ্যে দেখা গেছে। ৫ আগস্টের পরপর বন্দিশালাগুলোর আলামত নষ্টের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার রহস্যময় অন্তর্ধানও দেখা গেছে। যেমনÑ ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো: আকবর হোসেনের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে গুম কমিশন প্রধান জানান, তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আগে তিনি কমিশনে হাজিরা দিয়েছিলেন। কমিশনের অন্য এক সদস্য জানান, পরে তিনি (আকবর) নাই হয়ে যান।
শীর্ষ অভিযুক্তদের ‘নাই’ হয়ে যাওয়া গুমের সুষ্ঠু বিচারে বাধা তৈরি করবে। এর আগে আমরা শেখ হাসিনার পলায়নের পর ছয় শতাধিক বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযুক্ত সামরিক বাহিনীর আশ্রয় থেকে চলে যেতে দেখেছি। অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় সোপর্দ করা সবার দায়িত্ব। গুমের আরেকটি ভয়ের দিক ছিল ভারতীয়দের সাথে যোগসাজশ। অনেককে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। গুম হওয়া তিন শতাধিক মানুষের এখনো কোনো হদিস নেই। বাংলাদেশের গুম আন্তঃদেশীয় অপরাধ হয়ে উঠেছিল। তাই দেশের বাইরের সম্পৃক্ততাও আমলে নিতে হবে। আমাদের হাতে থাকা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে ভারতের সাথে বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে। দুই দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এটি করতে হবে। ভারতকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে।
গুমের দায়ে অভিযুক্ত আসামিরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ভুক্তভোগীরা এখনো নিরাপত্তা শঙ্কা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তারা এখনো হুমকি পাচ্ছেন। কমিশনের কাছে এ ধরনের হুমকির অডিও রেকর্ড রয়েছে। সঙ্গত কারণে গুমের তদন্ত ও বিচারে দেশের ভেতরের হুমকিগুলো সবার আগে নিষ্ক্রিয় করা জরুরি।