যে জাতি নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে যায়; তার স্থায়িত্ব পৃথিবীতে খুব বেশি দিন দীর্ঘায়িত হয় না। এমন দুর্ভাগা জাতির ভাগ্যলিপি হয় অন্য জাতিতে লীন হওয়া। এই পরিণতির কথা স্মরণে রেখে প্রতিটি দেশ পাঠ্যপুস্তকে নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিফল ঘটিয়ে থাকে। আমরা যেন এক হতভাগা জাতি- তাই তো দেখা যায়, জাতীয় জীবনে যে ঘটনাগুলো বাঁকবদলের ভূমিকা রেখেছে সেগুলো আমরা বেমালুম ভুলে যাই। যেখানে জাতীয় জীবনে বাঁকবদলের ঘটনাগুলো আগামীর পথচলার দিশা হতে পারত। এর সর্বশেষ নজির মাত্র এক বছর আগে ঘটে যাওয়া চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মতো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে স্থান না পাওয়া।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি। এমন দায়িত্বহীন আচরণের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে হটানোর সেই বীরত্বগাথা এবারের পাঠ্যবইয়ে স্থান পাচ্ছে না।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নতুন বাংলাদেশের এসব তরুণ শিক্ষার্থীর আত্মত্যাগের কথা এখন আড়াল করার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। শহীদের রক্তের দাগ শুকানোর আগে শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ভুলিয়ে দেয়ার আয়োজন যেন সম্পন্ন করা হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে টেন্ডারপ্রক্রিয়া শেষে উচ্চমাধ্যমিকের জন্য ১০ লাখের বেশি পাঠ্যবই মুদ্রণের কার্যাদেশ দেয়া হবে। যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে গত বছরে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোর ঘটনা যুক্ত করা হয়। গত বছর আগস্টের পরে অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন প্রেক্ষাপটে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক পর্যায়ের কয়েকটি শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে জুলাই-আগস্টের আধেয় সংযুক্ত করে ছাপা হয়। সেই বই এখন শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হচ্ছে। অথচ এক বছর পরেও উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কোনো আধেয় নতুন বইয়ে যুক্ত না করার ঘটনা দুঃখজনক।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরে উচ্চমাধ্যমিকের এসব বই মুদ্রণের অনুমতি দিয়ে রয়্যালটি বাবদ এনসিটিবি এক কোটি ২০ লাখ টাকা আয় করবে। বইয়ের পাণ্ডুলিপি সংশোধন কিংবা জুলাই অভ্যুত্থান সংযুক্তির চেয়ে এনসিটিবি এ আয়ের দিকে বেশি মনোযোগী। ফলে জন-আকাক্সক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে যারা নানা পদে দায়িত্বশীল রয়েছেন তাদের একটি অংশ এখনো পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই জুলাই অভ্যুত্থানকে তারা উপেক্ষা করতে চেয়েছেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক প্রফেসর ফাতিহুল কাদির সম্রাট নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা মৌখিকভাবে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে জুলাই-আগস্টের ঘটনা যুক্ত করতে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছিলাম। মন্ত্রণালয় এ নিয়ে এনসিটিবিকে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তাই নতুন পাঠ্যবইয়ে জুলাই অভ্যুত্থান যুক্ত করা হচ্ছে না।
প্রশ্ন হলো- মন্ত্রণালয় কেন চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে এমন উদাসীন এবং এনসিটিবি নিজেও কেন বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলো। আমরা মনে করি, মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির যাদের অবহেলায় উচ্চমাধ্যমিকে জুলাই-আগস্টের ঘটনা স্থান পায়নি তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।