অন্য কয়েকটি জেলার মতো সিরাজগঞ্জও নদী ভাঙনকবলিত একটি জেলা। নদীভাঙনের শিকার এই জেলার বহু দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় নেন বাঁধ, রাস্তা কিংবা অন্যের জমিতে। তখন এক দুর্বিষহ জীবনে নিপতিত হতে হয় তাদের। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অবর্ণনীয় কষ্ট মুখবুজে সহ্য করেন। কষ্টই যেন তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া এ জেলার এনায়েতপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার মানুষ সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবিতে গত শনিবার মানববন্ধন করেছেন।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুনর্বাসন দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন এনায়েতপুর সদর থেকে পাঁচলি পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকায় যমুনার ভাঙনে গৃহ ও আশ্রয়হীন পরিবারগুলোর নারী-পুরুষসহ, শিশু ও বৃদ্ধরা। এ সময় বক্তারা বলেন, এনায়েতপুরের ব্রাহ্মণগ্রাম থেকে হাট পাঁচিল পর্যন্ত নদীভাঙনে শতাধিক মানুষ এখন গৃহ ও আশ্রয়হীন। এসব অসহায় মানুষকে দ্রুত পুনর্বাসনে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়।
একই দাবিতে শাহজাদপুরে মানববন্ধন করে সেখানকার নদীভাঙনের শিকার অসহায় মানুষরা বলেন, খরস্রোতা যমুনার ভাঙনে কয়েক বছরে তাদের দুই শতাধিক বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এর পর থেকে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। আমরা কোনো ত্রাণ বা সাহায্য চাই না, আমরা চাই স্থায়ীভাবে একটু মাথাগোঁজার ঠাঁই। পায়ের তলায় একটু মাটি আর মাথার উপরে একটি চাল।
গত বছরের নভেম্বরে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষাবাঁধ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নদীর তীরে জেগে ওঠা চরে শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে হবে না, পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করতে হবে।’ নদীর তীর কবে জাগবে আর কবে সেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন হবে- তা কারো জানা নেই। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি নদীভাঙনের শিকার আশ্রয়হীন অসহায় মানুষের হাহাকার।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান অব বাংলাদেশ (২০২৩-৫০)’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রধান দুই নদী পদ্মা-যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে যমুনায় বিলীন হয়েছে ৯৩ হাজার ৯৬৫ হেক্টর, আর পদ্মায় ৬৩ হাজার ৫৫৮ হেক্টর। গড়ে প্রতি বছর তিন হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি জমি বিলীন হচ্ছে। নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, রাস্তা, বাঁধ ও অবকাঠামো।
জলবায়ু পরিবর্তনে নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে সত্য; কিন্তু এর শিকার মানুষকে পুনর্বাসনে সরকারের যে ধরনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, তা নেই। ফলে এসব মানুষের ‘দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরী’ যেন কাটে না।
সরকার শহরের শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষের জন্য হরেক রকমের প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা খরচ করে তাদের উন্নত জীবন আরো উন্নত, সুখী ও মসৃণ করার চেষ্টা চালায়; কিন্তু নদী ভাঙনকবলিত মানুষের জন্য সরকারের কোনো কিছু করার থাকবে না, তা হতে পারে না।
আমরা আশা করি, সরকার সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর ও শাহজাদপুরে যমুনার ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।