ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে হাসিনা ছিলেন পরোয়াহীন। আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেননি। নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে আয়োজন করেছিলেন গণ-নজরদারির। বিরোধী দল ও ভিন্নমতের লোকদের এর নিশানা করা হতো। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকার চরমভাবে এর মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয়। এ জন্য সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ খরচ করে কেনা হয় উচ্চতর নজরদারি প্রযুক্তি। এ কাজে নিযুক্ত করা হয় র্যাব-পুলিশসহ সরকারি বাহিনীকে। বহু মানুষ এতে আক্রান্ত হয়ে বিপন্ন হলেও গণনজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারেননি। বর্ষা বিপ্লবের পরেও এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। জননিরাপত্তার স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত দরকার।
একটি দৈনিকে গণ-নজরদারি গোপন প্রযুক্তি কেনা ও এর ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালে এ প্রযুক্তি কেনে। পুলিশ ও র্যাবের জন্য কেনা এ নজরদারি সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় হয় এক হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে এনটিএমসি ব্যাপকভিত্তিক গোপন নজরদারি ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিভাইস থেকে বার্তা চুরি, বাধাদান ও শনাক্ত করা হতো। ইন্টারনেট ও টেলিকম ট্রাফিক থেকে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করা হতো। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় নিবিড় নজরদারি ব্যবস্থা এর মাধ্যমে স্থাপন করা হয়।
গোপন যন্ত্রের মাধ্যমে র্যাব-পুলিশ নজরদারি চালাত। এর মাধ্যমে জনসাধারণের মোবাইল সিগন্যাল বøক, মোবাইল কার্যক্রম নজরদারি, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির তথ্য-উপাত্ত দেখানো হতো। ব্যক্তির অবস্থান নির্ণয় ও পরিচয় শনাক্ত করা হতো। বিস্তৃত এই নজরদারি কাঠামোর ভেতর সারা দেশের মানুষ ছিল। এ ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা বিশেষত শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী। হাসিনা এটি আমদানি করেন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ব্যবহারে। যাতে বিরোধী মতের লোকদের দমন করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সভ্য দেশ এ ধরনের স্পর্শকাতর সরঞ্জাম নিপীড়ক সরকারের কাছে বিক্রির বিরুদ্ধে। দেখা যাচ্ছে, হাসিনা সরকার গোপনে এ দেশগুলোকে ফাঁকি দিয়ে তা কিনেছে দেশের মানুষকে দমন, নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার হরণে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে এ নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে; বিশেষ করে দেশ অন্তর্ঘাতমূলক হামলার আশঙ্কায় পড়লে। সম্প্রতি ৪০০ সন্ত্রাসীকে আওয়ামী লীগ বড় ধরনের নাশকতা চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ দেয়ার খবর ফাঁস হয়েছে। তাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা তারা করে যাচ্ছে। এই অবস্থায় এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে গুপ্ত নজরদারির দরকার আছে। তবে সেটি যাতে কোনোভাবে সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয় তার নিশ্চয়তা দরকার। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করে।
গোপন গণ-নজরদারি কেনার সাথে জড়িত ব্যক্তি এবং এর ব্যবহার করে যারা নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটিয়েছেন; তাদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট তদন্ত উদ্যোগ দরকার। এ ব্যাপারে অসতর্ক হলে আবারো এ প্রযুক্তি গণমানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে।