শিশুরা জীবনের কিশলয়। আশার ফসল। উম্মাহর চোখজুড়ানো ধন। পৃথিবীতে কোনো শিশুই বলতে পারে না- তার জন্ম কেমন মা-বাবার ঘরে হবে। মা-বাবা ধনী হবেন না গরিব হবেন তা জানে না। কিংবা শিশু বয়সে বাবা-মাকে হারাবে বা তাদের বিচ্ছেদের শিকার হবে কি-না তাও জানা থাকে না। জানা সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো- শিশুরা এগুলোর শিকার হচ্ছে। হতে হচ্ছে। শিশু বয়সে বাবা-মাকে হারাচ্ছে। অভিভাবকহারা হচ্ছে। একা হয়ে পড়ছে। অসহায় হচ্ছে। ফলে তারা জীবনধারণের জন্য বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছে পথ। পথেই বড় হচ্ছে তারা। তাই তাদের বলা হচ্ছে পথশিশু।

সমাজের এসব অসহায় পথশিশুর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য সরকারি-বেসরকারি যে ধরনের উদ্যোগ থাকা দরকার ছিল তা নেই। বিশেষ করে সরকারি উদ্যোগ খুব হতাশাজনক। গত মঙ্গলবার ঢাকায় বেসরকারি সংস্থা কারিতাস প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯১ শতাংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে রয়েছে। এই জনগোষ্ঠী চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করছে এবং জীবিকার তাগিদে তাদের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করছে। দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি কর্মসূচি নিলেও পথশিশুদের প্রায় ৯৪ শতাংশ সরকারের কোনো রকমের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। এই শিশুদের ৫৮ শতাংশেরই জন্ম সনদ নেই, ফলে তারা শিক্ষার অধিকারসহ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

গত বছরের মার্চ মাসে সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত ‘স্ট্রিট সিচুয়েশন্স ইন বাংলাদেশ-২০২৪’ (বাংলাদেশে পথের পরিস্থিতি) শিরনামে পথশিশুদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ ‘পথশিশুদের নিয়ে নানা ধরনের আনুমানিক হিসাব রয়েছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট বাবা-মা নেই এমন ৩৪ লাখ পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন করার নির্দেশনা দেন। সেই হিসাব থেকে ধারণা করা যায়, বাবা-মায়ের যত্ন ছাড়া পথে বাস করা শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে ৩৪ লাখ। চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পরিবারগুলোর গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন শিশুদের পথে ঠেলে দিচ্ছে।’

সমাজের সুবিধাবাঞ্চিত পথশিশুদের অবহেলিত রাখলে বিপদ শুধু বাড়বে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পথশিশুদের একটি বড় অংশ মাদকের সাথে সম্পৃক্ত। তারা রাস্তায় থেকে নিয়মিত মাদক নেয়। একই সাথে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িত হয়।

পথশিশুদের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী উপযোগী করে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগও নিশ্চিত করা দরকার। যাতে দ্রুতই তারা তাদের শিক্ষা কাজে লাগাতে পারে। এর মধ্য দিয়ে পথশিশুদের পথে থাকার পথ অনেকটাই বন্ধ হবে। নতুন করে যাতে পথশিশু তৈরি হতে না পারে- সেই রাস্তাগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

পথশিশুদের নিয়ে বড় কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন রাষ্ট্রের সদিচ্ছা। রাষ্ট্র যদি পথশিশুদের বিষয়ে ভালো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে, সেখানে বিদেশী কিংবা বেসরকারি অনেকেই এগিয়ে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।