বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা বারবার হোঁচট খেয়ে নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। একানব্বইয়ে গণতন্ত্রের অপেক্ষাকৃত শুভ সূচনা হয়েছিল। তখন দেশ ফের সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে ফিরে আসে। রাষ্ট্রের একধরনের বিকাশ হতে থাকে। পনেরো বছরের মাথায় দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে এই দেশ আবার পথ হারায়। দেড় যুগের চরম স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদ ও অপশাসনে জর্জরিত হয়ে আবারো চালু হয়েছে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা। দেখা যাচ্ছে, পুরনো শাসনের অপছায়া এর ওপরেও ভর করেছে। বিশেষ করে সংসদে ভিড় জমিয়েছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা। জনস্বার্থ রক্ষার বদলে আশঙ্কা জন্ম নিয়েছে একটি শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধা প্রভূত বেড়ে যাওয়ার।

সংসদীয় সরকার কায়েম হলেও ফ্যাসিবাদী শাসনামলে কার্যত একটি চক্রের কাছে দেশ কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। নির্বাচনের নামে তামাশা করে শেখ হাসিনা নিজের লোকদের সংসদে জড়ো করেছিলেন। আত্মীয়স্বজন, খয়ের খাঁ এবং তোষামেদকারী অংশটির বাইরে সেখানে সবাই ছিলেন ব্যবসায়ী। জুলাই বিপ্লবের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা সুযোগ না পেলেও অবার ব্যবসায়ীরা নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী দল বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই ব্যবসায়ী। দলটির বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ১৪৫ জন ব্যবসায়ী। স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত সাতজনের পাঁচজন ব্যবসায়ী। তারা সবাই বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়েছেন। জামায়াতের নির্বাচিত ৬৮ এমপির মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী। এনসিপির ছয়জনের মধ্যে দু’জন ব্যবসায়ী। সবমিলিয়ে সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৭৪ জন ব্যবসায়ী। তারাই মোট নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ।

২০২৪ সালের আমি-ডামির নির্বাচনে ২৯৯ এমপির মধ্যে ২০০ জন ছিলেন ব্যবসায়ী। যারা মোট সংসদ সদস্যের ৬৭ শতাংশ। যদিও চলমান সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের সাথে আগের সদস্যদের তুলনা সমীচীন নয়। তারা দুর্নীতি অনিয়মের সাথে সেভাবে সংশ্লিষ্ট নন; কিন্তু শ্রেণিবিচারে অবস্থান একই। আবার টাকার জোরে প্রার্থিতা বাগিয়ে নেয়ার আগের যে সংস্কৃতি, অনেক ক্ষেত্রে তার অনুসরণ হয়েছে। গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা জয়ী হয়ে এলেও অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সাথে তাদের স্বার্থের সরাসরি সঙ্ঘাত আছে। রাষ্ট্রীয় সব নীতিতে তারা প্রাধান্য বিস্তার করে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করবেন এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের গণহারে আগমন একটি ইনসাফের দেশ গড়ার পথে অন্তরায়। অতি মুনাফা, মজুদদারি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আছে দেশে। একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার থাকার পরও কেন জনস্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে না ইতোমধ্যে সে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্বাচনে টাকার খেলার সুযোগে ব্যসায়ীদের সংসদীয় রাজনীতিতে আগমন ঘটে। জুলাইয়ের পর এই সংস্কৃতির অবসান ঘটবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল; কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই জন-প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আগামীতে যাতে এ ধারার রাজনীতি বন্ধ হয়, সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের সংশোধন করতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিভাবে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমিয়ে রাজনীতিকদের প্রতিস্থাপিত করা যায়। ব্যবসায়ীরা সংসদে থাকতে পারেন, তবে যেখানে স্বার্থের সঙ্ঘাত আছে সেখানে তাদের না রাখাই শ্রেয়।