জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আরো বেশি তীব্র হয়ে উঠছে এবং ঘন ঘন ঘটছে। বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। দরকার সময়মতো পূর্বাভাস পাওয়া, যাতে মানুষ সাধ্যমতো দুর্যোগ প্রস্তুতি নিতে পারে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেতে পারে। বিশ্বের সব দেশে এ জন্য আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়। আমাদের দেশেও একটি অধিদফতর আছে। কিন্তু তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। নেই নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ, নেই রাডার। এমনকি নেই দক্ষ জনবলও। অধিদফতর চলছে ধার করা তথ্য ও মান্ধাতার আমলের যান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়ে। বলা যায়, পুরো দফতরটিই কার্যত পঙ্গু। এই পঙ্গুত্ব নিয়েও দফতরটি যে সাধারণ ও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে পারে সেটিই আশ্চর্যের।

গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, আবহাওয়া দফতরের নিজের কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এবং সুপার কম্পিউটারের মতো উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা নেই। পাঁচটি রাডারের একটি সচল। দফতর বিমানবাহিনীর রাডারের তথ্য ভাগাভাগি করে কাজ চালায়। অথচ মেঘের অবস্থান, সম্ভাব্য গতিপথ, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, বজ্রঝড়ের গঠন, গঠনগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে রাডার অপরিহার্য। এসব তথ্য দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পাওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করেই পূর্বাভাস দেয়া হয়। অথচ তথ্য পাওয়ারই সুযোগ নেই। বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা দেয়ার জন্য দেশের আটটি স্থানে লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর স্থাপন করা হয় ২০১৮ সালে। সেগুলোও বিকল হয়ে আছে। শুধু তাই নয়, দক্ষ জনবলের অভাবে ডেটা বিশ্লেষণ বা মডেলিংয়েও রয়েছে চরম দুর্বলতা। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এমন ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

আবহাওয়া অধিদফতরের পাঁচটি রাডার স্টেশন আছে ঢাকা, রংপুর, কক্সবাজার, খেপুপাড়া (কলাপাড়া, পটুয়াখালী) ও মৌলভীবাজারে। এর মধ্যে কেবল রংপুরের রাডারটি সচল। রাডার অচল থাকলে স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাস দুর্বল হয়ে পড়ে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক অবশ্য সংশ্লিষ্ট দৈনিকের কাছে দাবি করেন যে, তাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কোনো কমতি নেই। সাম্প্রতিক সময়ের ভারী বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের বিষয়ে তারা ঠিকভাবেই সতর্ক করেছেন। কিন্তু বিষয়টি দফতরের পরিচালকের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। জনগণকে আবহওয়ার যথাযথ পূর্বাভাস দেয়া যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি পূর্বাভাস প্রস্তুত করার জন্য যোগ্য ও দক্ষ লোকবলসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর জোগান দেয়াও তারই দায়িত্ব। আগের সরকারগুলো দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। বর্তমান সরকারকে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

আবহাওয়া দফতরের পুরনো সব যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো দরকার। স্যাটেলাইট, বজ্রপাত ডিটেকশন সেন্সর স্থাপন, সারা দেশ আওতায় আনার সক্ষমতাসম্পন্ন রাডার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার দরকার হবে এমন নয়। হলেও সমস্যা নেই। কারণ একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে অথবা বন্যায় লাখো কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটে। দুর্যোগের ঠিকঠাক পূর্বাভাস পাওয়া গেলে সম্ভাব্য ক্ষতির অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।