বাংলাদেশ পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ পীড়ন ও জবরদস্তির শাসনের পরে মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ নিচ্ছেন। হাসিনার আমলে গণশত্রুতে পরিণত হওয়া পুলিশ বাহিনী এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অপরাধীরা এ সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ঘোরতর অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তেমনটি হয়নি। মূলত দীর্ঘ পীড়নের শিকার মানুষ চরম ধৈর্যের পরিচয় দেয়াতে দেশ রক্ষা পাচ্ছে। তবে সন্তুষ্ট থাকার কোনো অবকাশ নেই। সংঘটিত অপরাধ দমনে যেসব দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে তাতে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে খুনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে খুনের মামলা হয়েছে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি, এপ্রিলে ৩৩৮টি, মে’তে ৩৪১টি, সর্বশেষ জুনে হয়েছে ৩৪৪টি। মামলার প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশি খুন হয়েছে। যেসব এলাকা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং যেখানে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হয়। মূলত চাঁদাবাজিসহ অবৈধ সুযোগ-সুবিধার নিয়ন্ত্রণ নিতে পক্ষগুলোর মধ্যে পেশিশক্তির প্রতিযোগিতা হয়। আওয়ামী আমলে যেসব চক্র এগুলো নিয়ন্ত্রণ করত তারা পালিয়ে যাওয়ায় নতুন চক্রের কারা এর নিয়ন্ত্রণ নেবে তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি চলছে। রাজনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া কেবল পুলিশ দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

একই সময়ে ডাকাতি-ছিনতাই ও অপহরণের সংখ্যাও বেড়েছে। এর সাথে পুলিশি কার্যক্রমের দুর্বলতার বিষয়টি সম্পৃক্ত। ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পুলিশ একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছিল। পুলিশপ্রধান নিজে পালিয়ে যান। এমনকি রাস্তার ট্রাফিকও অদৃশ্য হয়ে যায়। পুলিশ দিয়ে সাধারণ মানুষকে দমন করতে গিয়ে হাসিনা পুরো বাহিনীটিকে গণশত্রু বানিয়ে ফেলেন। এরপর পুলিশ তার কার্যক্রমে ফিরে এলেও এর বড় একটি অংশ অভিযুক্ত হয়ে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। বাহিনীর মনোবল এখনো ফিরে আসেনি। এ অবস্থায় খোদ পুলিশ নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে জনগণের ক্ষোভ যেমন প্রকাশিত হচ্ছে; আবার তাদের দুর্বলতায়ও অপরাধীরা চড়াও হতে পারছে। গত ছয় মাসে পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় ৩২৯টি মামলা হয়েছে। ঠিক এ সময়ে চাঁদাবাজি-ছিনতাইসহ অপরাধ জগতে নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে। দুর্বল পুলিশি ব্যবস্থায় তাই কিছুটা বেশি খুনোখুনি হচ্ছে। এ সময়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে সংঘটিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এখন গতানুগতিক বিবেচনায় দেখা যাবে না। একে দেখতে হবে নজিরবিহীন গণ-অভুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থার আলোকে। তবে ঘটে চলা একটি অপরাধও হালকা করে নেয়া যাবে না। একটি মানবিক দেশ গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি ঘটনার প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে মাঠে এখন সেনাবাহিনী রয়েছে। নিয়মিত নানা নামে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও কেন অপরাধ কমছে না, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে ।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বাহিনীর ঘাটতি কোথাও সেটি চিহ্নিত করতে হবে। পেশাদারভাবে শতভাগ আদেশ কার্যকর করে এমন একটি বাহিনী হিসেবে পুলিশকে মাঠে হাজির করতে হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।