দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা অবহেলিত হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ঝোঁক বেশি। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো প্রকল্প না নিলেও প্রাথমিকের অবকাঠামো উন্নয়নে বারবার প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। সন্দেহ নেই, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজনীয়। কিন্তু তা শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে বেশি জরুরি হতে পারে না।

একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মোট তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন যাচাই-বাছাই করছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর আগে শেখ হাসিনার শাসনামলে ৩৩ হাজার কোটি টাকার দু’টি প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। সেসব প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা অর্জন লক্ষ্য হলেও শিক্ষার্থী ঝরেপড়া রোধ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া মূল লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মূল্যায়ন প্রতিবেদন-২০২২ অনুযায়ী, ২০২২ সালে সরকারি প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় ৫১ ও গণিতে ৩৯ শতাংশ কাক্সিক্ষত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীতে বাংলায় এই হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ।

২০১১ সালের প্রতিবেদনের তথ্য মতে, তখন তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় ৬৭ শতাংশ ও গণিতে ৫০ শতাংশ কাক্সিক্ষত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ২৫ আর গণিতে ৩৩ শতাংশ। ওই অনুযায়ী, একযুগে শ্রেণী বিবেচনায় কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জনে তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় এ হার কমেছে ১৬ শতাংশ। গণিতে অবনতির মাত্রা ১১ শতাংশ। পঞ্চম শ্রেণীর বাংলায় পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও গণিতে অবনতির মাত্রা ৬ শতাংশ।

দেশে এ মুহূর্তে পাঁচ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। এর মধ্যে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারি স্কুলগুলোতে ক্রমাগত কমছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের প্রতিবেদন-২০২৩ অনুসারে, ২০১৮ সালে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৪ হজার ১৪৭টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৪ জন। তবে পাঁচ বছর পর ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি। আর ২০২৩ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ- গত পাঁচ বছরে দেশে ১৯ হাজার ৫১৭টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১২ লাখ দুই হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী কমেছে।

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে কাক্সিক্ষত শিক্ষাসেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। মানুষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তাদের সন্তানদের জন্য যে ধরনের শিক্ষা আশা করেন, তা দিতে পারছে না। প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাহিদার আলোকে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, সিলেবাস পুনর্বিন্যাস এবং সারা দেশে দরিদ্র অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার কর্মসূচি চালু করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারকে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নেও মনোযোগী হতে হবে।