সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় পাইকুরাটি ইউনিয়নের মাসকান্দায় (গলইখালী) বিশ্বরোডসংলগ্ন নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটি ভাটায় ফসলি জমির শ্রেণী পরিবর্তন না করে মাটি ও বালু উত্তোলন করায় স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করায় কৃষকরা ক্ষুব্ধ।

স্থানীয়দের বরাতে নয়া দিগন্তের খবর বলছে, এই ইটভাটার কারণে এলাকার প্রায় ১০ হাজার একর বোরো জমির ফলন হুমকিতে পড়েছে। মাটির উর্বরতা কমে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। উল্টো রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের খরচ বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। ভাটাসংলগ্ন কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা ভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ফসলি জমির আঙিনায় ইটভাটা স্থাপনের কোনো নিয়ম নেই। কিসের ভিত্তিতে এর নিবন্ধন দেয়া হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, অবৈধভাবে মাটি কাটার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই ভাটাকে প্রথমবার এক লাখ ও দ্বিতীয়বার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় একটি ইটভাটা স্থাপনেই ১০ হাজার একর ফসলি জমির উৎপাদন হুমকিতে, এ খবর গভীর উদ্বেগের। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে জমি জীবিকার প্রধান অবলম্বন। অথচ স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় উর্বর জমিকে ইটভাটার কাঁচামালে পরিণত করা হচ্ছে, যার প্রভাব কেবল কৃষকের আয়ে সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য- সব ক্ষেত্রে পড়ছে।

ইটভাটা স্থাপনে উর্বর মাটি কেটে নেয়া হলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়। একদিকে জমি নিচু হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ে। অন্যদিকে মাটির জৈবগুণ ধ্বংস হয়। ফলে দীর্ঘদিন সেই জমিতে স্বাভাবিকভাবে ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় বাতাসে কার্বন ও ক্ষতিকর কণার মাত্রা বাড়িয়ে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। কালো ধোঁয়া শুধু ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে না, জনস্বাস্থ্যেও ঝুঁকি তৈরি করে।

আইন অনুযায়ী কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপনে কঠোর বিধিনিষেধ আছে। তবু বাস্তবে দেখা যায়, প্রভাব খাটিয়ে এসব ভাটা গড়ে উঠছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। আবার কখনো যোগসাজশ, এ সমস্যা জটিল করে তুলছে। প্রশ্ন হলো- আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন কোথায়?

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠেছে। অবৈধ ইটভাটা চিহ্নিত করে দ্রুত বন্ধ করা। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। কৃষিজমি সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ অধিদফতরের সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, যেমন- ব্লক ইট ব্যবহারে উৎসাহ ও প্রণোদনা দেয়া। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে ইটভাটার ওপর চাপ কমবে।

সবচেয়ে বড় কথা, কৃষিজমি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। আজ যদি ১০ হাজার একর জমি হারাই, কাল তার প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারে। তাই উন্নয়নের নামে কৃষিজমি ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মপাশার ঘটনাটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মাশুল দিতে হবে একদিন। কৃষিজমি রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। এই সত্য আমাদের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সবার মনে রাখা জরুরি।