বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বহু বাড়লেও জাতীয় উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা অর্জন ও গণতন্ত্র রক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জবরদখলকারী সরকার ও অসৎ মালিকপক্ষের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে মিডিয়া। ফ্যাসিবাদী সরকারের দীর্ঘ শাসনে মোটাদাগে এটিকে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মালিক ও সাংবাদিকদের একটি অংশ অসাধু উপায়ে কিছু লাভবান হলেও বৃহত্তর সাংবাদিক সমাজ ও জাতি বঞ্চিত হয়েছে। এর সূত্র ধরে গণমাধ্যমে এখনো বিরাজ করছে এক অসুস্থ পরিবেশ। অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যম সংস্কারে একটি কমিশন গঠন করে দেয়। গত শনিবার কমিশন ১৮০ পৃষ্ঠার সংস্কার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশনের কার্যপরিধি ছিল গণমাধ্যমকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করা।
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে সাংবাদিকরা যাতে কোনো চাপ বোধ না করে সেজন্য ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৪৯৯, ৫০০ এবং ৫০২ ধারা, ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারাসহ এ সংক্রান্ত অন্যান্য আইনের ধারা বাতিল ও সংশোধনের সুপারিশ করেছে কমিশন। প্রস্তাবে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শুরুর বেতন নবম গ্রেডের সাথে সঙ্গতি রেখে করার কথা বলা হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ায় ঢাকার সাংবাদিকদের আলাদা ‘ঢাকা ভাতা’ এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অবসরভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পরিচয়পত্র ছাড়া এবং বিনাবেতনে কোনো সাংবাদিককে অস্থায়ী, স্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যাবে না।
আমাদের দেশে সাংবাদিকতা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা হিসেবে বিবেচিত, কারণ এ পেশায় উপযুক্ত বেতন-ভাতা পাওয়া যায় না, এর উপর রয়েছে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর শঙ্কা। সংস্কার কমিশনের এ প্রস্তাব কার্যকর করা গেলে সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে শক্ত পাটাতন পাবে বলে আশা করা যায়।
গণমাধ্যম মালিকানার ব্যাপারে বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। একটি হাউজের কাছে দু’টি গণমাধ্যমের মালিকানা থাকতে পারবে না। এর ভালো দিক হচ্ছে কিছু ধনী অর্থের জোরে যেভাবে একাধিক মিডিয়া মালিক বনে যাচ্ছেন, তাকে রোধ করা সম্ভব হবে। তবে এর ফলে মিডিয়ার বিস্তার বাধাগ্রস্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষুণ্ন্ন হবে কি না, ভেবে দেখা দরকার। বিটিভি, বেতার ও বাসসকে একটি ব্যবস্থাপনায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি মালিকানায় থাকা এসব সংবাদমাধ্যম জনগণের উপকারে আসে না। এগুলোর জন্য দরকার সত্যিকারে পেশাদারত্ব অর্জন। গণমাধ্যমকে স্বাধীন জনবান্ধব ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সরকারের হাতে থাকা এসব মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারগুলো পক্ষপাতমুক্ত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকাশনা ও সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদান, নিউজপ্রিন্ট মুদ্রণসামগ্রী ও সম্প্রচার সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক আরোপ, সরকারি বিজ্ঞাপন বরাদ্দে সরকারের মর্জিমাফিক হস্তক্ষেপ। এসব ব্যাপারে একটি স্বচ্ছতার নীতি গ্রহণের তাগিদ কমিশনের প্রতিবেদনে রয়েছে।
বাংলাদেশের মিডিয়া বৈশ্বিক মান বিবেচনায় পিছিয়ে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। বিদ্যমান বাস্তবতায় মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন কিছুটা দুঃসাধ্য বটে। তবে এর আংশিক বাস্তবায়ন হলেও গণমাধ্যমে আশাজাগানিয়া পরিবর্তন আসবে।