জাতি এখন পুরোই নির্বাচনমুখী। রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয় ১০ মাস আগে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রাথমিকভাবে জনগণের আকাক্সক্ষা ছিল তারা রাজনীতিসহ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়নের চক্র ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করবেন। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরুও করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে অনেক কমিশন গঠন করা হয় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে। কিন্তু গত ১০ মাসে সব কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়নি।
ফ্যাসিবাদী সরকার ও তার গণহত্যার বিচার, সংস্কার এবং তারপর নির্বাচন এমন একটি গণ-আকাঙ্ক্ষা শুরু থেকেই ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান কুশীলব দেশের ছাত্র ও তরুণ সমাজ, অন্যতম শরিক রাজনৈতিক দলগুলো গণ-আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে এক থাকতে পারেনি। নানা কারণে নির্বাচনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। এক ধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। সবশেষে গত ১৩ জুন শুক্রবার লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মধ্যে বৈঠকে নির্বাচন বিষয়েই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়। সরকার ২০২৬ সালের জুন নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা শুরু থেকেই বলে এলেও লন্ডন বৈঠকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।
লন্ডন বৈঠকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিল, যে সময়েই হোক তা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশনের আছে। তিনি কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরোদমে প্রস্তুতি নেয়ার তাগিদও দিয়েছেন।
সামনের ছয় মাসে সংস্কার ও বিচার সম্পন্ন হওয়া কতটা সম্ভব সে বিষয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। কারণ, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সংস্কার কতটুকু সম্পন্ন করা সম্ভব তা নিয়ে কোনো পক্ষই একটি কথাও বলছে না। এমনই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিষয়টি দৃশ্যত চাপা পড়ে গেল।
গত ১৭ বছরে জাতি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি এবং আওয়ামী সরকারের তিনটি নির্বাচন দেখেছে। প্রথম নির্বাচনটি হয়েছিল বিদেশী শক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। পরের তিনটি নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন, রাতের ভোটের এবং আমি-ডামির নির্বাচন। যে আইনি কাঠামোর অধীনে এসব কেলেঙ্কারির নির্বাচন হতে পেরেছে সেই কাঠামোতেই আগামী নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে মনে করার কারণ আছে। দেখা যাচ্ছে, গণ-আকাক্সক্ষা নয়, রাজনৈতিক দলের আকাক্সক্ষাই পূরণ হতে যাচ্ছে এবং সেটি গত ৫৪ বছরের ধারাবাহিকতারই অনুসৃত।
সম্ভবত আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করতে হবে। তারপরই শুরু হবে দলগুলোর নির্বাচনী তৎপরতা। কিন্তু এরই মধ্যে বর্তমান কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিষয়টি উপেক্ষা করার নয়। প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমর্যাদা নিয়ে ইসি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবে কিভাবে!