ইতিহাসের নিকৃষ্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিচার শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম মামলা, যাতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য মামলায় হাসিনার সাথে তার প্রধান সহযোগীরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে তার সাড়ে ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনে গুম খুন লুটপাট মুদ্রাপাচারসহ হেন কোনো অপরাধ নেই যা শেখ হাসিনা ও তার অলিগার্করা করেননি। দেশের ভুক্তভোগী জনগণ সেই বড় বড় অপরাধেরও উপযুক্ত ও ন্যায্য বিচার চায়। তারা চায়, এ বিচারপ্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।
রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখাই ছিল হাসিনার শাসনের মূলনীতি। এ কাজে যারা অবৈধভাবে তাকে সহযোগিতা করতেন তাদেরও তিনি অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিতেন। ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতেন। চক্রবৃদ্ধি হারে যেন হাসিনার শাসনকে এই অপকৌশল শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় তিনি সাড়ে ১৫ বছর সফলতা পেয়েছেন। বাস্তবে এটি তার পায়ের নিচে মাটি সরিয়ে দিয়েছিল, যে ব্যাপারে তার হুঁশ ছিল না, জুলাইতে যা প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মনে করেছিল নিষ্ঠুরতা চালিয়ে আগের মতো সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন; হাসিনার কাছ থেকে আগের মতো পুরস্কার পাবেন। এতে করে পুরো দেশকে তারা বধ্যভূমি বানিয়ে ফেলে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে, ভবনের ছাদে স্নাইপার নিয়োগ করে হত্যা করা হয়।
নারী-পুরুষ-শিশু কেউ তাদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। মৃতের লাশের সাথে জীবিতদের পর্যন্ত পুড়িয়ে দেয়া হয়। মাত্র ৩৬ দিনে দুই হাজার হত্যা ও ৩০ হাজার মানুষ অঙ্গহানি কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করে। চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে বাদিপক্ষ আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগনামা দায়ের করেছে। এতে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, যাতে রয়েছে জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সাথে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য রয়েছে। এমন এক সময় হাসিনা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্র করেছেন যখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। কোনো কিছুই গোপন রাখা যায় না। ভিডিও ফুটেজ, ড্রোন ও সিসিটিভি ফুটেজ, আসামিদের টেলিফোন সংলাপের অডিও ক্লিপ সবই ট্রাইব্যুনালের কাছে হাজির করা হয়েছে। এসবের ফরেনসিক প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে।
এমন এক সময় হাসিনার বিচার হচ্ছে যখন বাংলাদেশে হাসিনা নিজে অবিচারের ভূরি ভূরি নজির সৃষ্টি করেছেন। এমনকি বিচারের প্রহসন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছেন। সে জন্যই চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ উত্থাপনের আগে আদালতে বলেন, ‘এ বিচার অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা।’ বিচারের ধীরগতি নিয়ে অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেন। দেশ-বিদেশে বহু পক্ষ আমাদের এই বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে। এমনভাবে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যাতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে। অপরাধীও উপযুক্ত দণ্ড পায়।