দিল্লির তাঁবেদার শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর পর থেকে ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে ‘পুশইনের’ মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের জন্য নতুন ঝামেলা সৃষ্টি করছে। দেশটি এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও মানবাধিকার আইনের তোয়াক্কা করছে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি ও বাংলাদেশ সরকারের লিখিত প্রতিবাদও আমলে নিচ্ছে না দিল্লি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বহুবার দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তে ‘পুশইন’ প্রক্রিয়াকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিকে রাষ্ট্রবিহীন করে তোলার ঝুঁকি তৈরির কারণে এ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে আসছে সংস্থা দু’টি। ২০১৮ সালেও এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল, ভারতের পুশব্যাক নীতিতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়। এতে মানুষ রাষ্ট্রবিহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

অবৈধ অভিবাসীর তকমা দিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে গ্রেফতার বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর তাদের তুলে দেয়া হচ্ছে বিএসএফের হাতে। বিএসএফ সময়-সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে তাদের। এমন পরিস্থিতিতে আরো উদ্বেগজনক খবর পাওয়া গেছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, আসামে নাগরিক পঞ্জিতে বাদ পড়া ১৯ লাখ বাংলাভাষীকে ‘চিহ্নিত বিদেশী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছে ভারত সরকার। এ দিকে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের আসাম রাজ্যজুড়ে ছয়টি কারাগারের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা হয়েছে বন্দিশিবির। এসব বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে বিদেশী চিহ্নিত বাংলাভাষীদের। আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে সম্প্রতি বন্দিশিবিরের নাম বদলে ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’ করা হয়েছে।

ভারতীয় বাংলা গণমাধ্যমের বরাতে নয়া দিগন্তের খবর, সম্প্রতি বিধানসভায় দেয়া আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য থেকে বাংলাদেশে পুশইন অব্যাহত রাখার ওই মহাপরিকল্পনা ফাঁস হয়। শর্মা রাজ্যের আইনসভায় ঘোষণা দেন, ‘যাকে বিদেশী হিসেবে শনাক্ত করা হবে তাকে সরাসরি বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের আইন অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।’

লক্ষণীয়, আমাদের সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন বেশি হওয়ার কারণ, ভারতের মেঘালয়ে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি রেখে সিলেটের সীমান্তজুড়ে পুশইন অব্যাহত রাখা। গত এক মাসে শুধু সিলেট বিভাগের চার জেলার সীমান্ত দিয়ে ৬০৭ জনকে পুশইন করেছে বিএসএফ।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা ভারতকে জানিয়েছি, আমাদের বাংলাদেশী যদি কেউ ইন্ডিয়ায় থেকে থাকেন, আপনারা প্রপার চ্যানেলে পাঠান। যেমন বাংলাদেশে যেসব ভারতীয় আছেন, তাদেরকে আমরা যথাযথ চ্যানেলে পাঠাই।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘পুশব্যাক কোনো সমাধান নয়। কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া, আলাপ-আলোচনা ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা সম্ভব নয়।’

এ সঙ্কট সমাধানে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত যাতে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় সে জন্য দিল্লির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। ঢাকাকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।