পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা রাজনৈতিক ভিন্নমত নিধনের নীতি গ্রহণ করেন। এ জন্য একটি ঘাতকবাহিনী গঠন করেছিলেন। এর সদস্যদের নেয়া হয় প্রচলিত সব বাহিনী থেকে। সীমাহীন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের এ দলে ভিড়িয়েছিলেন। এ বাহিনী নিশানা করে বিরোধী নেতাকর্মীদের। সাধারণ নাগরিকও সরকারের সমালোচনা করে এদের রোষানলে পড়েন। তাই দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ গুমের শিকার হন ফ্যাসিবাদী শাসনে। ৫ আগস্টের পর গুপ্ত বন্দিশালা থেকে গুমের শিকার অনেকের মুক্তি মিললেও একটি অংশের এখনো খোঁজ নেই। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, গুম থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা এখনো আতঙ্কে আছেন। অন্য দিকে গুম খুনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা এখনো বহালতবিয়তে আছেন। এ কারণে গুপ্ত কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও গুমের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছেন না।

সম্প্রতি বিবিসি এক প্রতিবেদনে আয়নাঘর থেকে উদ্ধার পাওয়া ভুক্তভোগীদের নিয়ে একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে, কিভাবে তারা শঙ্কার মধ্যে অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। গুমের শিকার ইকবাল চৌধুরী যিনি আরো আগে ২০১৯ সালে বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান। কিন্তু বাড়ি থেকে এরপর তিনি বের হননি; এমনকি বাজার করার জন্যও নয়। কারণ তাকে শাসানো হয়েছিল বন্দিশালা নিয়ে কোনো কথা কাউকে বলতে পারবেন না। বলা হয়েছিল এ ব্যাপারে কিছু ফাঁস করলে, আবার তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে, এরপর তার অস্তিত্ব বিনাশ করা হবে। তখন থেকে তিনি এতটা তীব্র মানসিক আঘাতে তটস্থ হয়ে আছেন যে, দেশ ছেড়ে যেতে চান। আয়নাঘরে জীবনের বড় একটি অংশ কাটানো আরমান বিন কাসেম বিবিসির প্রতিবেদককে অন্ধকার প্রকোষ্ঠটি দেখান। প্রতিবেদক লিখেছেন, প্রবেশের সময় মনে হচ্ছিল জীবন্ত কবর দেয়া হচ্ছে, বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। প্রকৃতির আলো পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, রাত না দিন তা বোঝার সেখান থেকে কোনো উপায় ছিল না। টর্চের আলোয় প্রতিবেদক দেখতে পান, একজন গড়পরতা ব্যক্তির সোজা হয়ে দাঁড়াতে ওই প্রকোষ্ঠে অসুবিধা হবে। চার পাশে দুর্গন্ধ। কিন্তু এখন ভেঙেচুরে এমন অবস্থা করে রাখা হয়েছে, যেখানে আলামত ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে। সারা দেশে এ ধরনের ভয়াবহ ৫০০ থেকে ৭০০ প্রকোষ্ঠ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের বৈদ্যুতিক শকসহ বীভৎস কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের অনেকে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। গুম কমিশনের কাছে এক হাজার ৬৭৬টির বেশি অভিযোগ পড়লেও প্রকৃত গুমের ঘটনা এর চেয়েও বেশি।

ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন। অথচ তারা বিচার পাওয়ার পরিবর্তে জীবন-শঙ্কায় রয়েছেন। অন্য দিকে যারা এ অপরাধ করেছেন তাদের একটি অংশ দাপটের সাথে বাহিনীগুলোতে রয়েছেন। তাই গুম হওয়া ব্যক্তিদের শুধু জীবনের শঙ্কা দূর করা নয়; বরং তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তা না হলে ৫ আগস্ট হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ বৃথা হয়ে যাবে। আশঙ্কা থেকে যায় যে, এসব অপরাধী ফের দেশকে গুম খুনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে এদের অপসারণ করতে হবে। সেই সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।