পতিত ফ্যাসিবাদী হাসিনার শাসনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ দানবে পরিণত হয়েছিল। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা তার সাক্ষী হয়ে থাকল। আবরারকে রাতভর নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে, পুরো দেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বুয়েটের ক্যাম্পাসে শোকাতুর শিক্ষার্থী ও মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। তার পরও ঘটনার বিচারের সুযোগও প্রায় রুদ্ধ করে দেয়া হয়। হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে এই আশাও একরকম ছেড়ে দিয়েছিল আবরারের পরিবার। শেষ পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ শাস্তির রায় ঘোষিত হয়েছে। দেশবাসী আশা করে, সহপাঠীকে হত্যাকারী বর্বরদের শাস্তি কার্যকরের মাধ্যমে দেশে ন্যায়বিচারের একটি নজির হয়ে থাকবে এই ঘটনাটি।

উচ্চ আদালত গত রোববার এক রায়ে আবরারের খুনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মীর মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে দ্বৈত আদালত এই রায় দেন। বিচারিক আদালত (নিম্ন আদালত) ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর একই রায় দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালত বলেছেন, নিম্ন আদালত তার রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তাতে হস্তক্ষেপ করার মতো কিছু তারা পাননি।

আবরার ফাহাদ ভারতের পানি আগ্রাসন ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া নানা অন্যায় নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা ফাহাদকে শিবিরকর্মী আখ্যা দিয়ে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। কেউ শিবির করলে তাকে হত্যার বৈধতা দিয়েছিল হাসিনা ও তার সরকার। ভারতের কোনো ধরনের সমালোচনা করাও গুরুতর অন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ কারণে আবরার হত্যার বিচার হবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেলের দেয়া মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘এই রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে বার্তা গেল, আপনি যত শক্তিশালীই হন না কেন, সত্য ও ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়।’ হাসিনার নির্মম শাসনে সবকিছু ছিল তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তাই অপরাধী ছাত্রলীগের বিচার তিনি হতে দেবেন না এটি সবাই ধরেই নিয়েছিল। আবরারের ভাই ফাইয়াজের কণ্ঠেও সেই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। রায়ের পর তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে এত বড় একটি রায়, এক বছর আগে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’ এই রায় ক্ষমতার দাপটে ধরাকে সরাজ্ঞানকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটি সাবধানবাণী। স্বৈরাচার চিরকাল টিকে থাকে না; সুতরাং তার ছায়ায় অপরাধ করলে চিরজীবনের জন্য রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এই রায়ের ফলে সেটিই প্রমাণ হলো।

আর যেন একটি প্রাণও ক্যাম্পাসে না ঝরে, কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। এই আকুতি জানিয়েছেন রায়ের পর আবরারের মা। আমরা বলতে চাই, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বর্বরতার দিনগুলো ক্যাম্পাসে আর কখনোই যেন ফিরে না আসে। এখন বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দণ্ড কার্যকর করতে হবে। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে জাতি এই বড় অপরাধের দায় থেকে মুক্ত হবে।