বিগত স্বৈরশাসনে নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা জাতীয় জীবনের প্রধান সঙ্কট হিসেবে হাজির হয়। হাসিনার মাফিয়া চক্রের সামনে এ সময় কোনো মানুষ আর নিরাপদ থাকল না। খোদ আওয়ামী লীগের লোকেরাও এ চক্রের শিকার হয়েছেন। হাসিনার আমলে দেশের মূল সমস্যা ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ইতিবাচক কাজ করেছে, এমনকি হাসিনা পালানোর পর সরকার গুম-খুন বন্ধ করতে পেরেছে। তবে আসল কাজ খুনে বাহিনীকে শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার কাজটি এখনো সম্পন্ন করা যায়নি। উদ্ধার হওয়া মানবাধিকার তাই আবার যেকোনো সময় হুমকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

গুম নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও তারা এ নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। এ জঘন্য অপরাধের তদন্তে সামরিক প্রশাসন সহযোগিতা করলে অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা সহজ হয়ে যায়। উল্টো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অবাধ তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়েছে। গুম কমিশন সূত্রে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, বাহিনীর সাধারণ সদস্যরা যারা নির্মম বেদনাদায়ক গুম-খুনের প্রত্যক্ষদর্শী তারা অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। তারা এ আশঙ্কা বোধ করেন, অপরাধী মূল দায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের জীবন, সম্মান ও সম্পদ ক্ষতির মধ্যে পড়বে। একই ধরনের খবর গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পক্ষে শুরু থেকে পাওয়া গেছে।

গুম থেকে ফেরত ব্যক্তিরা চিরতরে চুপ হয়ে গেছেন। তাদের বলা হতো, জীবন ভিক্ষা দেয়া হয়েছে; তারা যেন কোনোভাবে গুমের ব্যাপারে কখনো মুখ না খোলে। হাসিনা পালানোর পর দেশ স্বাধীন হয়েছে বলা হলেও একই ধরনের ভীতি একটি শ্রেণীকে এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) ১১ জন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি জারি করা পরোয়ানা তামিল করা যায়নি। এদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছিল গুম কমিশন। তাদের পাসপোর্টও বাতিল করা হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসের দিকে এসে জানা যাচ্ছে, তারা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। অথচ হাসিনা পালানোর পর এরা সবাই সামরিক ব্যারাকে কর্মরত কিংবা অবসরে ছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচার ও তদন্তের গতি সব ক্ষেত্রে ঠিকভাবে এগোচ্ছে না। অন্তত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সেটি করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে এখন সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান। বিগত সরকারের সময় ঘটা সবচেয়ে বড় অপরাধের বিচার সম্ভব না হলে এ সংস্কার কাজে আসবে না। আরেকটি ফ্যাসিবাদের আগমন ঠেকাতে হলে আগে এসব ভয়াবহ অন্যায়ের বিচার হতে হবে। হাসিনার খুনি চক্রকে শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত। আমাদের সামরিক প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে, তাদের ওপর যেন কোনো দায় এসে না যায়। অল্প কিছু অসৎ বিবেচনাহীন ব্যক্তিকে আলাদা করার মাধ্যমে আমাদের নিরাপত্তাবাহিনীগুলো পরিশুদ্ধ হয়ে যাক-এটি সবার প্রত্যাশা।