দেশের পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন ঘটলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। সরকারের কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্তে বাজারে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারপরও কিছু সমস্যা নিশ্চয় আছে। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে দেশের দুর্নীতি ও অনিয়ম-অব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ছিল পুঁজিবাজার। একাধিকবার পুরো বাজার লোপাট করেছে সরকার সৃষ্ট অলিগার্করা। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে তারা। পুঁজিবাজার সাধারণ বিনিযোগকারীদের নয়; হয়ে উঠেছিল প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ও শাসক শ্রেণীর স্বার্থ চরিতার্থের ক্ষেত্র।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাজারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসইসি পুনর্গঠন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং এ বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। পুঁজিবাজার সংস্কারে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স। এটি বেশকিছু সুপারিশ করেছে। যদিও এর সুফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তবে অনিয়ম বন্ধ হয়েছে, দুর্নীতি বা কারসাজির অভিযোগও শোনা যাচ্ছে না। অর্থাৎ একধরনের সুশাসন এখন বাজারে বিদ্যমান। সেই সাথে সরকারের উদ্যোগ ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পুঁজিবাজারের সুষ্ঠু বিকাশে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাজারে গতি ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানো ও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বিনিয়োগক্ষেত্র হিসেবে শেয়ারবাজারে আসছেন। সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পাঁচ দফা নির্দেশনা ও পুঁজিবাজার সংস্কারের আশ্বাস। প্রধান উপদেষ্টা তার নির্দেশনায় পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানির সরকারি শেয়ার ছাড়া, ভালো দেশীয় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ দেয়া, বিদেশী বিশেষজ্ঞ দিয়ে বাজার সংস্কার, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় কোম্পানিগুলোকে ঋণের বদলে শেয়ার বা বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করার নির্দেশনা দেন। সরকার পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পসুদে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপিটাল মার্কেট সাপোর্ট ফান্ড’ গঠনেরও নির্দেশনা দিয়েছে। মূলত এ দু’টি পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে। যার প্রতিফলন হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসা। যারা আশাহত হয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারাও এখন ফিরতে শুরু করেছেন।

যদিও শেয়ার দরের উত্থান-পতনের সাথে সূচকেরও ওঠানামা হচ্ছে। এটি অস্বাভাবিক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সবশেষ গত সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন চলে।

বাজারে শুধু উত্থান ঘটবে- এটি হতে পারে না। তবে টানা উত্থান বা টানা দরপতন যেন না হয়। পুঁজিবাজার আর যেন অর্থ লুটের আখড়া না হয়। এখন দরকার বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা। সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় আছে। এটিই সব সময় কাম্য।