সমকালীন বিশ্বে উন্নয়নের পূর্বশর্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ যথাসম্ভব ঠিক রেখে যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। কিন্তু আমাদের দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে, তা ক্ষেত্রবিশেষে পরিবেশ বিনষ্ট করছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, উন্নয়নের নামে রীতিমতো প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে, প্রাণীদের অভয়ারণ্য ধ্বংস হচ্ছে। এর নজির রয়েছে অনেক। এ ধরনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন যে টেকসই হতে পারে না, সে কথা নীতিনির্ধারকরা রীতিমতো ভুলে যান।

বনাঞ্চল ধ্বংস করে সড়ক নির্মিত হলে কী অবস্থা হয়; তার প্রমাণ চুনতি অভয়ারণ্য। এশিয়ার হাতির অন্যতম প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি অভয়ারণ্য। ১৯ হাজার ১৭৭ একর বনভূমি নিয়ে গড়ে উঠেছে এটি। এর ভেতর যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামো উন্নয়নে সঙ্কুচিত হচ্ছে বনাঞ্চলটি। হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার বন্যপ্রাণী। একটি সহযোগী দৈনিকের লোহাগাড়া উপজেলা সংবাদদাতার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে এ প্রকল্পের নাম ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (ফেইজ-২)। এই প্রকল্পের কিছু অংশ চুনতি অভয়ারণ্য দিয়ে নেয়া হবে। অথচ অভয়ারণ্য এলাকায় ফ্লাইওভার অথবা আন্ডারপাস নির্মাণ না করে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চুনতি অভয়ারণ্য ২৫০ একর বনভূমি হারাবে। কাটা পড়বে কয়েক হাজার গাছ। শুধু তাই নয়, বনের ৪৫টি হাতি প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পার হয়ে চুনতি অভয়ারণ্যে চলাচল করে, এগুলোও ঝুঁকিতে পড়বে।

২০১৮ সালে ১২০ একর বনভূমি অধিগ্রহণ করে চুনতি বনের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা হয় রেলপথ। এ কারণে কাটতে হয়েছে অভয়ারণ্যের পাহাড়। ফলে অপরিকল্পিত রেললাইনে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে বনের হাতি। রেলপথ নির্মাণে কেটে ফেলা হয়েছে বনের শতবর্ষী গর্জনসহ লক্ষাধিক গাছ।

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) বলেন, ‘চুনতি থেকে হারবাং পর্যন্ত ২০টি পয়েন্টে দলবদ্ধ হয়ে রাস্তা পারাপার হয় হাতি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সম্প্রসারণে ১০ কিলোমিটার এলাকায় ফ্লাইওভার অথবা আন্ডারপাস নির্মাণ না করলে বন ও বন্যপ্রাণী হুমকিতে পড়বে। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে চুনতি অভয়ারণ্য রক্ষায় সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে চিঠি দেয়া হয়েছে। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ ধ্বংস করে মহাসড়কের উন্নয়ন করলে সেটি ভবিষ্যতে খারাপ দৃষ্টান্ত হবে।

সরকারের কয়েক প্রকারের বন আছে। সাধারণ ও বিশেষ বন। সাধারণ বনের মধ্যে বনভূমি ও সামাজিক বনায়ন।

বিশেষ বনের মধ্যে অভয়ারণ্য গুরুত্বপূর্ণ। চুনতি অভয়ারণ্য আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ অভয়ারণ্য দিয়ে হাতি পারাপার হয়। অন্য দিকে ফ্লাইওভার নির্মাণ না করলে সমস্যা হবে। এটি বিবেচনায় নিতে হবে। চুনতি অভয়ারণ্যের একটি গাছও যাতে কাটা না পড়ে, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমরা যত গাছ লাগাই, তার চেয়ে বেশি কাটি- এটি কোনোভাবে কাম্য নয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার বেলায় যাতে কোনোভাবে প্রতিবেশ-পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সজাগ দৃষ্টি রাখা অতীব জরুরি।