চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে নজিরবিহীন অনিয়ম ঘটেছে। এ-সংক্রান্ত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছেন শিক্ষকদের বড় অংশ। খাতার ওএমআর অংশ বা ‘বৃত্ত’ পূরণের কাজ টিকটকার শিক্ষার্থীদের দিয়ে করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে; তদন্তে এর সত্যতা মিলেছে। অনেক শিক্ষক পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে খাতা দেখার কাজ করেছেন। অথচ পরীক্ষার উত্তরপত্র একটি গোপন দলিল এবং পরীক্ষকের কাছে এটি আমানত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। পরীক্ষক ছাড়া অন্য কেউ কোনোভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পারেন না। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় ফল বিপর্যয় হয়েছে। এবার এসএসসি ও সমমানে ছয় লাখ ৬৬০ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা অস্বাভাবিক। বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী উদ্বেগ, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এসব অনিয়মে খাতা পুনঃপরীক্ষার আবেদনও পড়েছে রেকর্ড-সংখ্যক। মোট দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৬৪টি খাতা চ্যালেঞ্জ করেছে শিক্ষার্থীরা। শুধু ঢাকা বোর্ডে ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছে ৯২ হাজার ৮৬৩ শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে মাত্র আটজন পরীক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। এ ছাড়া পরীক্ষকদের সতর্ক করে এটি যে দণ্ডনীয় অপরাধ সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, বোর্ড পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ওপর আস্থা রাখার উপায় নেই। এ মূল্যায়ন যে মানসম্মত নয় সেটিও বুঝতে পারছেন অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ সারা দেশের মানুষ। জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি আদৌ যথাযথ কি না এবং এ বিষয়ে বোর্ডের কোনো ধরনের নজরদারি আছে কি না।
পরীক্ষার খাতা যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া মানে একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন এলোমেলো এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ভুল মূল্যায়নে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখানো হলে তার হতাশা এমন তীব্র হতে পারে যে, সারা জীবনেও সে তা আর কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সাজানো গোছানো জীবন গড়ার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এর দায় বোর্ডকে নিতে হবে।
পুনঃনিরীক্ষণেও খাতা পুনর্মূল্যায়নের নিয়ম নেই। নিয়ম যেটি আছে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী প্রায়ই সন্তুষ্ট হয় না। তার হতাশা থেকে যায়।
একটি বিষয় স্পষ্ট, সমাজে সৎ মানুষের যেমন অভাব আছে, তেমনি শিক্ষকদেরও মানের অবনতি ঘটেছে। গত ১৫ বছরের দুর্বৃত্তায়নের শাসনে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে জাতিকে রসাতলে নেয়ার যে নীলনকশা অনুসরণ করা হয়েছে তা সবার জানা। প্রাথমিক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিভাবে অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ লোকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেটিও কারো অজানা নয়। এর কুফল আমাদের কতদিন ভোগ করতে হবে কেউ জানেন না।
শুধু বোর্ডের পরীক্ষার খাতার মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়; বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক সংস্কার কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশন করেনি। এ নিয়ে কে ভাববেন?