মার্কিন সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলাচলের পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণ করার দাবি অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নেই।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে বলেছে—"ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে না।"
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৩৮ কোটি (৩৮০ মিলিয়ন) ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিরাপদে অতিক্রম করেছে।
তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ
ইরানের দাবির সরাসরি জবাব: যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য মূলত ইরানের সেই বার্তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া, যেখানে তেহরান ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে প্রয়োজনে তারা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে।
বিশ্ববাজারকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা: হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র জানাতে চাইছে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সচল রয়েছে এবং তাদের নৌবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা তুলে ধরা: সেন্টকম ৮০০টির বেশি জাহাজ ও ৩৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল নিরাপদে পারাপারের তথ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কার্যকারিতা তুলে ধরতে চেয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক বার্তা: এটি শুধু সামরিক নয়, তথ্যযুদ্ধেরও অংশ। যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চাইছে যে আন্তর্জাতিক নৌপথ কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং ইরানের সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি করা উচিত নয়।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ, যেখানে বিভিন্ন দেশের জাহাজ চলাচলের অধিকার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। যদিও ইরান প্রণালীর উত্তর উপকূলের একটি বড় অংশের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে এবং সামরিকভাবে সেখানে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা রাখে, যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য হলো—এটি ইরানের একক নিয়ন্ত্রণাধীন জলপথ নয় এবং আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল বন্ধ করার বৈধ কর্তৃত্বও ইরানের নেই।
ইরানের সরকারি অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তেহরান বলছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলের বিষয়ে তাদের বৈধ ও বাস্তব প্রভাব রয়েছে এবং প্রয়োজনে তারা সেই ক্ষমতা ব্যবহার করবে। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর ইরান আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ইরানের বক্তব্যের মূল দিকগুলো হলো—
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব উপকূলীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে ইরানের।
যুক্তরাষ্ট্রই উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। তেহরানের অভিযোগ, মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক উপস্থিতি এবং হামলাই আন্তর্জাতিক নৌপথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার একটি ধারা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন। ওয়াশিংটন বলছে, এটি কেবল নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়; অন্যদিকে তেহরান বলছে, এটি হরমুজে ইরানের কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দেয়।
ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য
এখানে মূল বিরোধটি "নিয়ন্ত্রণ (control)" শব্দটির অর্থ নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক জলপথ; কোনো একক রাষ্ট্র এটি নিয়ন্ত্রণ করে না, এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত।
ইরানের অবস্থান: হরমুজের উত্তর উপকূলের বড় অংশ ইরানের হওয়ায় তারা নিরাপত্তা ও চলাচলের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং প্রয়োজনে সেই প্রভাব প্রয়োগ করবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে "ইরান হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করে না", আর ইরান বলছে "ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার কারণে হরমুজে তাদের নির্ধারক প্রভাব রয়েছে।" এই ভিন্ন অবস্থানই বর্তমানে ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। নতুন করে যুদ্ধ শুরু এই কর্তৃত্ব নিয়ে। ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হারালে শান্তি আলোচনার প্রধান শক্তি হারাবে। এ কারণে আলোচনা টেনে নিয়ে আমেরিকা হরমুজ প্রণালীতে মিত্রদের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত