বাংলাদেশে এই প্রথম মাতৃগর্ভে থাকা যমজ সন্তানের জটিল চিকিৎসায় সফলভাবে একটি অত্যাধুনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের ফিটো-মেটারনাল মেডিসিন ইউনিটে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে নেতৃত্ব দেন চীন থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডা: তাজমিরা সুলতানা (সহযোগী অধ্যাপক) ও ডা: মাসউদা সুলতানা (সহকারী অধ্যাপক)।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভবতী মায়ের যমজ সন্তানের মধ্যে একটি জটিল সমস্যা শনাক্ত হয়।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজমিরা সুলতানা জানান, পরীক্ষায় দেখা যায়, যমজ শিশুদের মধ্যে একটির স্বাভাবিকভাবে হৃদপিণ্ড তৈরি হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের জটিলতাকে সাধারণত টুইন রিভার্সড আর্টেরিয়াল পারফিউশন (TRAP) বা অ্যাকার্ডিয়াক টুইন জটিলতা বলা হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে মায়ের গর্ভে থাকা একটি শিশুর রক্তপ্রবাহ অন্য সুস্থ শিশুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে সুস্থ শিশুটির হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং তার জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সহজভাবে বলতে গেলে, একই গর্ভে থাকা যমজ সন্তানের মধ্যে একটি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত না হলেও অন্য সুস্থ শিশুর রক্তপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে বড় হতে থাকে। এতে সুস্থ শিশুটির হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডা. তাজমিরা সুলতানা বলেন, এ ধরনের যমজ সন্তান সাধারণত একই প্লাসেন্টা ভাগাভাগি করে, যাকে মনোকোরিওনিক টুইন (Monochorionic Twin) বলা হয়। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা দিতে হয়।

তিনি জানান, আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জটিলতায় আক্রান্ত শিশুর রক্তপ্রবাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন (RFA) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জটিলতায় আক্রান্ত শিশুটির রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে সুস্থ শিশুটিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়।
তিনি আরও জানান, মাতৃগর্ভে যমজ সন্তান থাকার ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়মতো সঠিকভাবে এসব জটিলতা শনাক্ত করে আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে সুস্থ শিশুর জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়ে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের আধুনিক ও জটিল চিকিৎসাসেবা এটিই প্রথম। মাতৃগর্ভে থাকা জটিল শিশুর চিকিৎসায় ফিটো-মেটারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউনিট প্রধান ডা: তাবাসসুম গণি সহ ফ্যাকাল্টি মেম্বার ডা: ফেরদৌস আরা, ডা: আরিফা শারমিন, ডা: দিনা লায়লা হোসেন, ডা: হাফিজা ফারজানা, ডা: ফারহানা ইসলাম, ডা: রুবাইয়াত সানিয়া, ডা: মিম শাহরিনসহ ফেলো স্টুডেন্ট।
এ চিকিৎসাকে দেশের চিকিৎসা খাতের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের জটিল চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ রোগীদের জন্য নতুন আশা ও আস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।