মাদরাসার শিক্ষাকাঠামোর সঙ্কট, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা - ৪
সাধারণ ধারায় বিলীন হয়ে স্বকীয়তা হারানোর আশঙ্কা
পাঠ্যপুস্তক কিংবা সিলেবাস অথবা পরীক্ষা পদ্ধতির কোনোটিই এখন আর আগের মাদরাসা শিক্ষা কাঠামোর স্বকীয়তা রক্ষা করতে পারছে না।
Printed Edition
দিনে দিনে সাধারণ শিক্ষা কাঠামোর মধ্যেই বিলীন হতে যাচ্ছে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। আধুনিকায়ন কিংবা মান উন্নয়নের নাম করে গত কয়েক বছরে মাদরাসার শিক্ষা মূল ধারা থেকে অনেকটাই সরে আসছে ইসলামী শিক্ষা। পাঠ্যপুস্তক কিংবা সিলেবাস অথবা পরীক্ষা পদ্ধতির কোনোটিই এখন আর আগের মাদরাসা শিক্ষা কাঠামোর স্বকীয়তা রক্ষা করতে পারছে না। ব্যতিক্রমী ধারা বজায় না থাকায় মাদরাসার প্রতিও আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। যদিও মাদরাসা শিক্ষার চাহিদা ও আবেদন চিরন্তন বলে মনে করছেন বিশিষ্ট্য শিক্ষাবিদ ও কওমি ঘরানার আলেমগণ।
আওয়ামী সরকারের সময়ে গত ১৬ বছরে প্রায়ই মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে দেশ বিদেশ থেকে কটূক্তি করা হয়েছে। জঙ্গিবাদের সাথে মাদরাসাগুলোকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। মাদরাসা শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বা সন্তানদের ভর্তি করানোর পেছনে কোনো খারাপ মতলব আছে কিনা তা নিয়েও অযৌক্তিকভাবে হয়রানি বা গোয়েন্দাগিরি করা হয়েছে। তারপরেও মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এটা এ দেশের আলেম সমাজের নিরলস প্রচেষ্টার ফলাফল বলেই মনে করছেন তারা।
অপর দিকে বিগত আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকেও মাদরাসা শিক্ষাকে সঙ্কুচিত করতে নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির বা উপায়ন্তরও খোঁজা হয়েছে। কৌশলে মাদরাসা শিক্ষাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যাতে অভিভাবকদের মধ্যেও মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে একটি বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করা যায়। মাদরাসার কারিকুলামের সাথে সম্পৃক্ত কয়েকজন জানান, কোনো এক সময়ে মাদরাসার বইগুলোর কন্টেন্ট লেখা বা বই প্রকাশের জন্য মাদরাসা বোর্ডের নিজস্ব ইউং কাজ করত। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা গেছে এখন মাদরাসার নিজস্ব বইগুলোও সাধারণ বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষা ধারার বই এবং মাদরাসার জন্য নির্ধারিত বই একই কন্টেন্টের ভিত্তিতেই লেখা হয়। তবে এখানে চাতুর্যতার সাথে শুধু মাদরাসার বইগুলোর কভার পেজে বা প্রচ্ছদে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড লেখা থাকে।
এ বিষয়ে গত কয়েক দিন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বই যেভাবে লেখা বা সম্পাদন করা হয় ঠিক একইভাবে মাদরাসা বোর্ডের বইগুলোও লেখা বা সম্পাদনা করা হয়। সূত্র মতে সাধারণ শিক্ষা কাঠামোতে প্রতিটি ক্লাসের বইয়ের কন্টেন্ট লেখা বা পরে এগুলো সম্পাদনা করেন সাধরাণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। একই সাথে মাদরাসার জন্য লিখিত বইয়ের কন্টেন্ট তৈরি বা সম্পাদনার কাজও করেন ওই সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাগণই। এখানে মাদরাসার বই আলাদাভাবে লেখা বা সম্পাদনার জন্য বিশেষভাবে মাদরাসায় পড়–য়া কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োজিত বা দায়িত্ব দেয়া কোনো সুযোগ নেই বা সুযোগ দেয়া হয় না। ফলে মাদরাসার পাঠ্যসূচির মৌলিকত্ব রক্ষা করা বা একে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ থাকছে না। এতে মাদরাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক মনে করেন, মাদরাসা শিক্ষাকে তার মূল স্বাতন্ত্র রক্ষা করেই চলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা অনেকটাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তিনি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বই রচনা ও সম্পাদনার জন্য সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ওপর নির্ভরশীলতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করেন।
অপর দিকে মাদরাসাগুলোতে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয় সেখানেও সাধারণ শিক্ষা এবং মাদরাসা শিক্ষাকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। বিগত বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ণ কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে মাদরাসাগুলোতেও শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ফলে মাদরাসার জন্য বিশেষভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এখন প্রতিটি মাদরাসা তীব্রভাবে অনুভব করছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে অভিন্ন প্রশ্নে জেনালের বিষয় এবং মাদরাসার জন্য আরবি শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সারা বছর যেসব প্রার্থী বিভিন্ন গাইড বা অন্যান্য প্রতিযোগিতার জন্য অভিন্ন সিলেবাসে পড়াশোনা করে তারাই প্রিলিতে ভালো ফল করে। তবে এই প্রার্থীরা অনেকেই থাকেন আরবিতে দুর্বল। কিন্তু প্রিলিতে পাস করে তারাই মোট নম্বরে এগিয়ে থেকে আরবি বিষয়েই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন। অপর দিকে আরবিতে যারা ভালো তারা সাধারণ বিষয়ে প্রিলিতে বাদ পড়ে গিয়ে শিক্ষক হিসেবে নিজেকে আর নিয়োজিত করতে পারছেন না। আবার এমনো হয় অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেশি থাকলে সেখানে ননএমপিও শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। গবেষণা বলছে ননএমপিও এই শিক্ষকদের বেশির ভাগই থাকেন আবরিতে দুর্বল। ফলে ক্লাসের শিক্ষার্থীরাও আববিতে দুর্বল হয়েই বের হচ্ছেন।
সরকারি বিভিন্ন নিয়মনীতির কারণেও মাদরাসাগুলো তাদের স্বাতন্ত্রতা হারাচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটার শর্তের কারণে অনেক মাদরাসায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে বাস্তব চিত্র হচ্ছে এটাই যে, নারী কোটার কারণে মাদরাসায় যেসব শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন তারা আরবিতে অনেকটাই দুর্বল থাকেন। এই অবস্থার পরিত্রাণ হওয়া জরুরি। কেননা আগের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সব যোগ্যতা থাকার পরেও একজন পুরুষ শিক্ষক প্রার্থী ৮০ নম্বর পেয়েও নিয়োগ পাচ্ছেন না আবার ওই একই যোগ্যতা নিয়েই একজন নারী প্রার্থী মাত্র ৫০ নম্বর পেয়েই চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন।
অবশ্য এসব বিষয়ের অবসান হতে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং এরপর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর কোটা প্রথা বাতিল হয়েছে। এখন প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব পর্যায়েই শিক্ষক নিয়োগ কোটা প্রথা বাতিল হওয়ায় যোগ্য এবং মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে। এতে মাদরাসাগুলোতেও দক্ষ যোগ্য প্রার্থীরাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন।