শিল্পবর্জ্যে মরে যাচ্ছে গাজিখালি নদী, জনজীবন অতিষ্ঠ

Printed Edition
bangla-1
শিল্পকারখানা থেকে রাসায়নিক বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে গাজিখালি নদী : নয়া দিগন্ত

নবীন চৌধুরী ধামরাই (ঢাকা)

ঢাকার ধামরাইয়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্তা গাজিখালি নদী এখন মৃতপ্রায়। বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় এর পানি এখন কুচকুচে কালো ও বিষাক্ত। নদীদূষণের ফলে আশপাশ পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীপাড়ের মানুষের দাবি, প্রশাসনের উদাসীনতায় কারখানাগুলো কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য অপসারণ করছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার বারবারিয়া এলাকা থেকে শুরু করে বাথুলি হয়ে বংশী নদীতে মেশা প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটির প্রাণপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে। এক সময় যমুনা ও ধলেশ্বরীর শাখা হিসেবে পরিচিত এই নদীতে সারা বছর স্বচ্ছ পানি থাকত। জেলেরা মাছ ধরতেন, কৃষকেরা সেচ দিতেন আর সাধারণ মানুষ গৃহস্থালির কাজে এই পানি ব্যবহার করতেন। অথচ এখন নদীর পানির দিকে তাকানোই দায়। পানির উপরিভাগে কেমিক্যালের সাদা ও কালো আস্তরণ পড়ে আছে।

নদীপাড়ের সত্তরোর্ধ্ব জয়ফুল বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা নদীর পাড়ের মানুষ বড়ই অসহায়। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে টেকা দায়। বৃষ্টি হলে গন্ধ আরো বাড়ে। শুধু গন্ধই না, বাতাসের বিষাক্ততায় আমাদের ঘরের টিন পর্যন্ত নষ্ট হয়ে ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে।’ বাথুলী এলাকার দোকানদার বাবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফ্যাক্টরির মালিকদের কাছে সবাই জিম্মি। অনেকে প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রতিবাদ করতে ফ্যাক্টরির ভেতরে যান, কিন্তু ফিরে এসে তারা আর কিছুই বলেন না।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত ১৫-২০ বছর আগেও এই নদী ছিল এলাকার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এখন নদীতে মাছের বংশ পর্যন্ত নেই। এই বিষাক্ত পানি কৃষিজমিতে দেয়ার ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গবাদি পশুকে এই পানি খাওয়ালে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ছড়াচ্ছে চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগবালাই। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি ব্যবহার না করে সরাসরি কেমিক্যাল নদীতে ফেলার কারণেই এই বিপর্যয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গাজিখালি অচিরেই একটি ‘মৃত নর্দমায়’ পরিণত হবে।

পরিবেশ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের এমন নীরবতায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, কারখানাগুলো প্রভাব খাটিয়ে পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে ধামরাইয়ের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ তমিজ উদ্দিন আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গাজিখালি নদীর দূষণ একটি বড় সমস্যা। আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে কথা বলব এবং কিভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায়, সেই ব্যবস্থা নেব।’ ধামরাইয়ের প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় গাজিখালি নদীকে দূষণমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীটি আবার তার পুরনো যৌবন ফিরে পাক; এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন এলাকাবাসী।