ঈদ-পূর্ব বিক্রয়চাপে পুঁজিবাজার সূচকের পতন

বিক্রয়চাপের কারণে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বেশিক্ষণ টেকেনি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের পতন দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু করেছে পুঁজিবাজার। পবিত্র ঈদুল ফিতর পূর্ববর্তী মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া বিক্রয়চাপই গতকাল সূচকের অবনতি ঘটায় বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। ঈদ-পূর্ব পুঁজিাবাজারের আর মাত্র একদিন বাকি। এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীরা যার যার অবস্থান থেকে বিনিয়োগের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। আবার অনেকে ঈদ পরবর্তিত বাজারের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নতুন করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। ফলে সূচকের অবনতি হলেও বাজারগুলো লেনদেনের দিক থেকে একটি ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে।

সূচকের উন্নতি দিয়েই গতকাল লেনদেন শুরু করে পুঁজিবাজারগুলো। কিন্তু বিক্রয়চাপের কারণে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বেশিক্ষণ টেকেনি। ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রথমদিকে সবগুলো সূচকের উন্নতি হলেও মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বিক্রয়চাপের মুখে নিম্নমুখী হয়ে ওঠে বাজার সূচক। প্রথমবারের এ চাপ একপর্যায়ে সামলে নিলেও বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিক্রয়চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। দিনের বাকি সময় আর এ চাপ সামলে উঠতে পারেনি বাজারগুলো। এভাবে সূচকের বড় অবনতি দিয়েই দিন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৯ দশমিক ২৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৩৬৮ দশমিক ৪০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩১৯ দশমিক ১৪ পয়েন্টে। সকালে লেনদেনের শুরুতেই সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৯২ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৩৪৫ পয়েন্টে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথমদিকের এ চাপ সামলে ফের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করে বাজার সূচক। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সূচকটি আবার ৫ হাজার ৩৭৩ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত সূচকের এ অবস্থান ধরে রাখে বাজারটি। কিন্তু পৌনে ১২টার দিকে নতুন করে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে বড় ধরনের পতন হতে থাকে সূচকের। বেলা সোয়া ১২টায় ডিএসই সূচক নেমে যায় ৫ হাজার ৩১৯ পয়েন্টে। দিনের বাকি সময় সূচকের এ অবস্থান ধরে রাখে ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২৩ দশমিক ১০ ও ৮ দশমিক ২৯ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই নামমাত্র দশমিক ৪৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। তবে বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি হয় যথাক্রমে ৬৪ দশমিক ৭৪ ও ১১ দশমিক ২৪ পয়েন্ট।

সূচকের পতনে ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল অবনতি হয় লেনদেনের। এদিন বাজারটির ৫২৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৬৮ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। তবে এদিন লেনদেনের উন্নতি হয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল এখানে ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হতে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার বাজারটির লেনদেন ছিল ১৪ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এখন অনেকটা ঈদের আমেজ। আর মাত্র একদিন লেনদেন হবে পুঁজিবাজারে। এর পর দীর্ঘ ছুটি। গত চারটি কর্মদিবসে সূচকের যে উন্নতি হয়েছে তাতে বাজারের মূল্যস্তরে বেশ ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বিনিয়োগকারীরা বিগত দিনগুলোতে বিনিয়োগের যে মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন তা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এতেই পতন ঘটেছে সূচকের। তবে তারা মনে করেন, লেনদেনের শেষদিন হয়তো এ চাপ নাও থাকতে পারে। কারণ এদিন শেয়ার বিক্রি করলেও হয়তো টাকা ক্যাশ করা সম্ভব হবে না। তারা মনে করেন, দীর্ঘ ছুটির পর ঈদ-পরবর্তী বাজার হয়তো আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

গতকাল ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা বাজার নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দিনের বাজার আচরণের কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, বিভিন্ন হাউজে বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা এ সময় বিক্রয়চাপ তৈরি করে না। তারা বরং এ সময় নতুন করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করে থাকেন। কারণ ঈদ-পরবর্তী বাজার সাধারণত ভালো হয়ে থাকে। তাই ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির চাইতে কেনায় এগিয়ে ছিলেন বলে মনে করেন তারা। তাছাড়া গত কয়েকদিনে বাজারের মূল্যস্তরে যে পরিবর্তন হয়েছে তা থেকে অনেকে মুনাফা নিতেই পারেন। এটি স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়া অন্য কিছু নয়।

সামনে ভালো বাজারের প্রত্যাশার কারণ জানতে চাইলে নয়া দিগন্তকে তারা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এখন পুঁজিবাজার নিয়ে কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তে পরিবর্তন আসতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ( ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) পর্ষদে। আর এভাবে একটি সম্ভাবনাময় পুঁজিবাজারের প্রত্যাশা করতেই পারেন বিনিয়োগকারীরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ছয় লাখ ৬৩ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৬৮ লাখ ১৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিটি ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রবি অজিয়াটা, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ব্র্যাক ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ইনটেক অনলাইন, সী পার্ল বিচ রিসোর্ট ও একমি পেস্টিসাইডস।

ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের এ কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিবিএস ক্যাবলস, ড্রাগন সোয়েটার এন্ড স্পিনিং, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট, ইনটেক অনলাইন, এল আর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ও সোনারগাঁও টেক্সটাইলস।