বিয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরাইলি বোমা কেড়ে নিল মুহান্নাদের জীবন
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিয়ের পোশাক তৈরি ছিল, বরযাত্রার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু শনিবার ভোরে ইসরাইলি বোমা সব শেষ করে দিল। খান ইউনিসের একটি তাঁবুতে হামলায় নিহত হলেন ২৬ বছর বয়সী মুহান্নাদ ওসমান ফারওয়ানা- বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। পাত্রী আসমা ইউসুফ নাজ্জার যে বর্ণিল মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলেন, সেটি আর এলো না। যে ঘরে উলুধ্বনি বাজার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু কান্না। পরিবার বলছে, ‘তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইল হত্যা থামায়নি।’ আলজাজিরা ও আইএমইএমসি নিউজের প্রতিবেদনে মুহান্নাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুধু মুহান্নাদই নন। একই দিন অধিকৃত পশ্চিম তীরের তেল রুমেইদায় একটি পরিবারের গাড়িতে ইসরাইলি সেনার গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে সাত মাস বয়সী শিশু স্যাম আবু হাইকাল। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দাদীর বাড়ি যাওয়ার পথে সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলি প্রথমে বাবা ফাহদের হাতে লেগে তার মায়ের শরীর ভেদ করে শিশুটির চোয়ালে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর শিশুটি মারা যায়, বাবা-মা আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজে : গত ১১ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বাস্তবে হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবারের ভোরেই খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল ও গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিম দিকে ভারী কামান দাগানো হয়। কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে একাধিক আবাসিক পাড়ায় হামলা চালানো হয়। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলের আল-দোরা শিশু হাসপাতালের আশপাশে ট্যাংক ও ড্রোন থেকে গুলি চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী, যাতে রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য গাজার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পাশের কৃষিজমিতেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৫১ জন নিহত ও ২ হাজার ৯৮৪ জন আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৮২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন আরো পাঁচজন, আহত ৪৯ জন। গাজা সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১৫৫ দিনেই নিহত হয়েছেন ৫৩৪ জন- প্রতি ছয় ঘণ্টায় একজন- আহত আরো ১ হাজার ৭৮২ জন। সংস্থাটি এই হত্যাযজ্ঞকে ‘বেসামরিক ও যোদ্ধার মধ্যে পার্থক্য না করা একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছে।
মিলানে শোকের মিছিল : ইতালির মিলানে গাজায় নিহত শিশুদের স্মরণে শত শত মানুষ নীরব মিছিলে অংশ নিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিহত ১৮ হাজার ৪৫৭ শিশুর নাম লেখা ২৭ মিটার দীর্ঘ একটি প্রতীকী সাদা কাফন বহন করে মিছিলটি ডুওমো স্কয়ার থেকে কাস্তেলো স্ফোর্জেস্কো পর্যন্ত এগিয়ে যায়। অংশগ্রহণকারীরা গাজায় বেসামরিক হত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানান।
হামাসের নতুন ঘোষণা : কায়রোতে ফিলিস্তিনের আটটি উপদলের বৈঠকের প্রাক্কালে হামাস জানিয়েছে, ভবিষ্যতে গাজার রাস্তায় কেবল ফিলিস্তিনি পুলিশই আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র বহন করবে- সশস্ত্র মহড়া বন্ধ থাকবে। তবে সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হুসাম বদরান স্পষ্ট করেন, এর মানে অস্ত্র সমর্পণ নয়। গাজার শাসনভার ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’-এর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে পরবর্তী আলোচনায় বিস্তারিত নির্ধারিত হবে বলে তিনি জানান।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে মুহান্নাদের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে, ছড়িয়েছে ক্ষোভ ও বেদনা। প্রশ্নটা একটাই- গাজায় কি বিয়ে করার, সন্তান কোলে নেয়ার, বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও নেই?