তার ছড়া-কবিতায় জনজীবন
প্রকৃত অর্থে, ছড়া মানব মনের আনন্দ সঞ্চয়ের জন্যে সৃজিত। কিন্তু আখন্দের ছড়ায় নিছক আনন্দ নয়; বরং আনন্দের পাশাপাশি গ্রামীণ এবং শহুরে দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জীবনকথন সুচারুরূপে ফুটে উঠেছে
Printed Edition
ড. ফাতেমা জোহুরা
পৃথিবীর মানচিত্রে সদ্য জন্ম নেয়া ‘বাংলাদেশ’-এর উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জেলা গাইবান্ধার মঙ্গার সাথে ঘর-গেরস্থালি করা জনপদে মাহফুজুর রহমান আখন্দের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পেশাগত জীবনচর্যার বাইরে তিনি গবেষক, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তার ছড়ায় মঙ্গার বেদনার্ত বাণী গ্রামীণ জনজীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইট-পাথরের শহুরে জীবনে স্থান করে নেয়। ছড়া বাংলা সাহিত্যের অতি প্রাচীন উপাদান; যা বঙ্গীয় নর-নারী, শিশু-কিশোরদের আনন্দ প্রকাশের অনন্য মাধ্যম। সাধারণত ছড়ায় কোনোরূপ অর্থ সঙ্গতি বা সামঞ্জস্য থাকে না। কিন্তু ছড়াকার মাহফুজ আখন্দের ছড়ায় সমকালীন মঙ্গাপিড়ীত নিম্নবিত্তের অসহায় মানুষের দুর্ভিক্ষতাড়িত জীবনের চিত্রকল্প প্রকাশ পায়। সেই সাথে পুঁজিপতি শ্রেণীর বিন্যাসের চালচিত্রও বিকশিত হয়।
ছড়ায় সাধারণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ অর্থ প্রকাশ না করলেও অসাধারণ প্রকাশ ভঙ্গিমার কারণে ছড়া সর্বজন আদৃত হয়। ভাষাশৈলী, ছন্দ, সামাজিক চিত্র ও ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে ছড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ছড়া মানব মনকে সর্বদা আন্দোলিত করে থাকে। মানুষের আত্মপোলব্ধি, অভ্যাস, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা, আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবই ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে থাকে। বাঙালির সহজ সরল জীবন প্যাটার্ন ছড়ার ছন্দে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। সাধারণ ছড়ায় বিশেষ কোনো ভাবের গভীরতা থাকে না। কিন্তু মাহফুজ আখন্দের ছড়ায় গ্রামীণ জনজীবন এবং বিশেষ শ্রেণীপেশার মানুষের জন্যে, বিলাসী শহরের বিলাসহীন জনমানুষের জবিনচিত্র বহুরেখিক মাত্রা পায়। সেই সাথে এক শ্রেণীর মানুষের জীবন বিত্তের পরিধি ছড়ার ছন্দোবদ্ধ কলাবরে ছড়িয়ে দেয় অনেকের অবগতির নিমিত্তে।
প্রকৃত অর্থে, ছড়া মানব মনের আনন্দ সঞ্চয়ের জন্যে সৃজিত। কিন্তু আখন্দের ছড়ায় নিছক আনন্দ নয়; বরং আনন্দের পাশাপাশি গ্রামীণ এবং শহুরে দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জীবনকথন সুচারুরূপে ফুটে উঠেছে। ছড়া যদিও শিশু-কিশোর মনের সহজ সরল অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায়। কিন্তু মাহফুজ আখন্দের ছড়ায় প্রকাশিত অভিব্যক্তি সেই সীমানা অতিক্রম করে বিশেষ শ্রেণীপেশার মানুষের জীবন-যন্ত্রণার কথা বলে। যে জীবন শহর এবং গ্রামের এক শ্রেণীর মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কন করে যারা তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়, এমনকি সবুজ-শ্যামল গ্রাম ছেড়ে ইট-পাথরের কঠিন শহরে ঘর বাঁধে; কিন্তু তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। তাই বলে তারা স্বপ্ন আঁকতে ভোলে না।
রিকশা চালায় বাবা আমার/পাথর ভাঙে মায়ে/আমি নূরি ময়লা টোকাই /নিত্য পেটের দায়ে। /ভাইটি আমার যায় হোটেলে রোজে /সকাল থেকে রাত অবধি /কাজ করে যায় নিরবধি /বাড়ি ফেরে ক্লান্ত দেহে দু’মুঠে ভাতের খোঁজে/আদর যতন ভালোবাসা / স্বপ্নে ওড়ে আকাশে /আমগো কপাল লাথি খেকো/অর্ধচাঁদও বাঁকা সে/ ‘ল্যাহা পড়া ওসব নাকি/বড় লোকের জন্যি/আমগো ঘরে নিত্য হানে/অভাব দশা-দন্যি’/আঁকছি তবু স্বপ্ন সুখের কল্পনা/সুখ নদীটা দেখাও খোদা/অনেক আশা-অল্প না!
যদিও ছড়া শিশুকিশোর মনের আনন্দ। ছন্দ ঝঙ্কারের সরল প্রাণের বার্তা প্রকাশ করে থাকে, এরপরও আমরা দেখতে পাই উল্লিখিত ছড়াটিতে জীবনের এক কঠিনতম চিত্র অঙ্কিত হয়েছে; যা বিশ্বায়নেরকালে পৃথিবীর তৃতীয় শ্রেণীর সব দেশের কিছু বিত্তবান মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা প্রকাশ করে। যে সমস্যাটি বাংলাদেশের গ্রামীণ হতদরিদ্র শ্রেণীর কথা প্রকাশ করে ছড়ার মাধ্যমে। তিনি ছড়ার কলেবরে আবহমান গ্রামবাংলার হতশ্রী মানুষের গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে চিত্র বৈশ্বিক সমস্যার চিত্র বলেই সবার কাছে প্রতীয়মান হয়।
ছড়া বাঙালি লোক সংস্কৃতির অমূল্যরতœ বিশেষ। আর সে রতেœর প্রকৃত অধিকর্তা গ্রামের খেটেখাওয়া রোদে পোড়া নিরক্ষর মানুষ। প্রকৃতির মতো নিরাভরণ যাদের জীবন, তাদের সন্তানকে ঘুমপাড়াতে মা ছড়া কাটেন-
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি/মোদের বাড়ি এসো/খাট নাই পালঙ্ক নাই/চোখ পেতে বসো/বাটা ভরে পান দেব/গাল ভরে খেয়ো/ খোকার চোখে ঘুম নাই/ঘুম দিয়ে যেয়ো।
মা ছড়া পারে না ঘুম পাড়ানির ছড়া কাটাতে, মা জীবন বাস্তববতার তাগিদে অন্নসংস্থান করতে ছোটে, আর তাই খোকার চোখে বসতে পারে না ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি। ইট পাথরের শহর ভীষণ প্রাণহীন, সেখানে দখিনা মিষ্টি বাতাস নেই, টাটকা বিশুদ্ধ ফল-শাক-সবজি, মাছ-মাংস নেই, নেই পায়ে হাঁটার মেঠোপথ। রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে নেই অবাধে সাতার কেঁটে স্নানের স্বাধীনতা। খাদ্য তালিকায় থাকে না মায়ের হাতের আদরের পরশমাখা মোয়া, গুড়-মুড়ি কলা, আর তাই শহরগুলো অনেকাংশে মায়া মমতাহীন। শহরে নিম্নবিত্তের মানুষদের যেখানে আবাসন সেখানে থাকে না ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি, মায়েরা কাটে না কোনো ছড়া। সেখানে কোনো দাদীমা কিংবা নানীমা শিশুদের বলে না রাজা-রানী, জ্বিন-পরী, দেও-দানা বা ভূত-পেতœীর গল্প। এ কারণে শহরের আলোক উজ্জ্বল আবাসনের বিপরীতে আলোকহীন বিবর্ণ ফ্যাকাশে শহর হয় ভুত্তুরি।
ধুত্তুরি ছাই ধুত্তুরি /শহরগুলো ভুতুরি। /মিষ্টি বাতাস হাওয়া নাই
টাটকা খাবার খাওয়া নাই/দীঘির জলে নাওয়া নাই/নাইকো কলা গুড়মুড়ি/ধুত্তুরি ছাই ভুতুরি/শহরগুলো ভুত্তুরি।
তার ছড়ার পরিসর গ্রামীণ আবহ থেকে পৌঁছে গেছে শহরে। তবে শহরের আলোকজ্জ্বল বর্ণিল জীবন প্রবাহ সেখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষগুলো ঠিকমতো দুবেলা অন্ন সংস্থান করতে না পারলেও প্রকৃতির অকৃতিম দান থেকে তারা কখনো বঞ্চিত হয় না। অপর দিকে শহরের সব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য শুধু একটি শ্রেণীর কাছে, বিরাজিত তাই শহর সেইসব মানুষের নিকট ভুত্তুরি বা ভুতুরে আঁধারে সমাচ্ছন্ন। সেখানে সবুজের কোনো সমারোহ নেই, গাড়ির কালো ধোঁয়ার সব সমাচ্ছন্ন। অনেকটা নিম্নবিত্তের মানুষের ভাগ্য তেমনি। মাহফুজুর রহমান আখন্দের ছড়াগুলো নিছক রবীন্দ্রনাথের ছেলে ভুলানোর ছড়া নয়, গ্রামের মেঠো পথ বেয়ে ভাগ্যান্বেষী মানুষের ইট-পাথরের শহরে গিয়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার ইতিবৃত্ত। তাই বলা যায়, মানব মনের আনন্দ প্রদেয় ছড়া একটি দেশের, বিশেষ জনপদের ভাগ্যচিত্র নিয়ে শহর এবং গ্রামের বাস্তব প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি; যা কিনা ছড়াকার মাহফুজ আখন্দের সম্পূর্ণ নিজস্ব মানসসঞ্জাত অভিব্যক্তি চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
তার ছড়ায় গ্রামীণ জনজীবন শহুরে জীবনালখ্যের সাথে ফুটে উঠেছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীর বর্ণনা। নদী তার ছড়ায় রূপময়চিত্র কল্প প্রকাশ করে, যার প্রচ্ছদে সবুজ শ্যামল গ্রাম বাংলার আবহমান নদীর কলধ্বনি আর তার বুকে ফুলেল চিত্র থাকে অপর দিকে সেই নদীর ধ্বংসাত্মক দৃশ্যও প্রকাশ পায়। যার জন্য এক শ্রেণীর মানুষকে বেঁচে থাকার তাগিদে বাস্তুভিটার মায়া ত্যাগ করে পাথুরে শহরের নির্মম স্থানে চলে আসতে হয়। সেখানে তাদের শ্রমের মূল্য ভীষণ সস্তা-
বাড়ি আমার সবুজ গাঁয়ে /ধরলা নদীর কুলে/দিন কেটেছে শালুক তুলে/চুল বেঁধেছি ফুলে/পাষাণ নদী ভেঙে নিলো ঘর/ফসল জমি ধু-ধু বালুর চর
... .... ....
খাটুনি আমার নিচ্ছে কিনে/ময়লা পানির দামে /তাও জোটেনা দুই মুঠো ভাত /গতর খাটা ঘামে!
পোড়খাওয়া মানুষগুলোর সস্তাশ্রম বিত্তবানেরা খুব সহজেই ক্রয় করে নেয়। অপর একটি ছড়ায় প্রকাশ পায় সর্বনাশা পদ্মার পাড়ের জনজীবনের বিস্তারিত কাহিনী-
চিনতে পারো তোমরা আমায়/আমি, আমি ফজল সরকার/এখন আমি ঠেলা খাটি/লাগবে কারো দর কার?/আমি এখন ঠেলাঅলা সরকার!/ভাগ্য আমার সব নিয়েছে/ঠেলা খানাই আছে আমার কাছে/আকাশ আমার মুক্ত ছিল/ভিটে মাটি সবুজ ছিল নানান ফলের গাছে/সব হারিয়ে এখন আমার/গতর খানাই আছে!/সেদিন রাতে আইলো ভীষণ ঝড়/ভেঙে নিলো গাছ গাছালি/উইড়া নিলো ঘর/এই সুযোগে সুদ মহাজন /করলো দখল ভিটে মাটি/হলাম অচিন, পর।
সব হারিয়ে ফজল সরকার পেটের দায়ে চলে আসে শহরে। সেখানে সে ঠেলাঅলা সরকার। যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সব হারিয়ে ক্লান্ত মানুষ। তখন নেমে আসে মহাজনের ঋণের করাল গ্রাস; যার জন্য মানুষগুলোকে সবুজ-সরল, সাদামাটা গ্রামীণ জীবন থেকে চলে আসতে হয় নির্মম অন্ধকার শহরের বস্তি জীবনে। অসাধারণ দক্ষতার সাথে ছড়ার মতো বিষয়ের মাধ্যমে বিশেষ শ্রেণীপেশার মানুষের গ্রাম ও শহর জীবনের চিত্রকল্প রচনা করেছেন ছড়াকার ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ। ছড়ার ক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব অনন্য এক মাত্রা যোগ হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে তিনি জাতিকে অনেক বড় কিছু উপহার দিতে সক্ষম হবেন।