বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি ইস্যুতে ব্রিতে অস্বস্তি ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’ বিতর্কে উত্তাপ
অবসরের আগে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে উদ্বেগ : স্বচ্ছতার দাবি জোরালো
Printed Edition
মো: আজিজুল হক গাজীপুর মহানগর
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি নীতিমালা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বিভাগভিত্তিক পদ্ধতি উপেক্ষা করে ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’র ভিত্তিতে পদোন্নতির উদ্যোগের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে ইতোমধ্যে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
দেশের কৃষি গবেষণার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ব্রিতে বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট এই বিতর্কে প্রশাসন, ডিপিসি (ডিপিসি-১) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বোর্ডের একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন ব্যাখ্যায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের মাধ্যমে পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রির বিদ্যমান প্রবিধান অনুযায়ী বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি হয়ে থাকে বিষয় বা বিভাগভিত্তিক (ডিসিপ্লিন-বেজড) কাঠামোর ওপর নির্ভর করে, যেখানে জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা ও বিশেষায়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তবে সাম্প্রতিক উদ্যোগে এই কাঠামো থেকে সরে এসে ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে গবেষণার মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে একাধিক বিজ্ঞানীর পক্ষে গত ২৪ মার্চ আইনজীবী কল্যাণ কুমার সাহার মাধ্যমে ব্রি মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাবর পাঠানো জাস্টিস ডিমান্ড নোটিশে বলা হয়েছে, এ ধরনের পদোন্নতি বিদ্যমান নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) প্রণীত ঘঅজঝ ঝপরবহঃরংঃং চৎড়সড়ঃরড়হ এঁরফবষরহবং (২০১০) অনুযায়ী, পদোন্নতি হতে হবে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার সমন্বয়ে (সবৎরঃ-পঁস-ংবহরড়ৎরঃু) এবং তা অবশ্যই বিভাগভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
শুধুমাত্র জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ নেই। একই সাথে ব্রি প্রবিধানমালা ২০১১ (সংশোধিত ২০১৯)-এও নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভাগভিত্তিক কাঠামো অনুসরণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
নোটিশে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, ঈরারষ চবঃরঃরড়হ ভড়ৎ খবধাব ঃড় অঢ়ঢ়বধষ ঘড়. ২৫৩ ড়ভ ২০১৩ মামলায় আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, ডিভিশনের বাইরে পদোন্নতি স্থগিত থাকলেও ডিভিশনের ভেতরে পদোন্নতি দেয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করেই করতে হবে।
আইনজীবী নোটিশে আরো সতর্ক করা হয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘন করে কোনো পদোন্নতি দেয়া হলে এর দায়ভার ব্যক্তিগতভাবে মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ওপর বর্তাবে।
প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান মহাপরিচালক আগামী ২ এপ্রিল অবসরে যাওয়ার (এলপিআর) আগে শেষ মুহূর্তে একটি মহলের প্রভাব বা চাপে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের পরিপন্থী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞানীদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও গবেষণার বিশেষায়ন উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেয়া হলে যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন ব্যাহত হবে এবং গবেষণার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনামও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মহাপরিচালকের বক্তব্য : ব্রির মহাপরিচালক ড. খালেকুজ্জামান পদোন্নতি নিয়ে ওঠা অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা ও নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই।
এটি একক কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও কমিটি সম্পৃক্ত থাকেন। ফলে এখানে নিয়ম লঙ্ঘনের প্রশ্নই ওঠে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘অবসরে যাওয়ার আগে তড়িঘড়ি করে বা নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি দেয়ার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সঠিক নয় এবং বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও নীতিসম্মত সিদ্ধান্ত না এলে বিষয়টি আইনি জটিলতায় রূপ নিতে পারে এবং তা প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সাথে ব্রির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভাগভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি; অন্যথায় এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।