আর কত মানুষ মারা গেলে সড়কমন্ত্রী অস্বস্তিবোধ করবেন?
গণভোটকে উপেক্ষিত হলে বাংলাদেশ আবারো জেগে উঠবে : হুঁশিয়ারি বিরোধী এমপিদের
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
আর কত মানুষ মারা গেলে সড়কমন্ত্রী অস্বস্তিবোধ করবেন সংসদে এমন প্রশ্ন রেখেছেন ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য। অন্যদিকে পটুয়াখালী-২ আসন থেকে নির্বাচিত দিলটির আরেক সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, গণভোটের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে গুম-খুনের ‘আয়নাঘর’কে সমর্থন করা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জনগণের আকাক্সক্ষা ও গণভোটকে ইগনোর (উপেক্ষা) করা হলে গোটা বাংলাদেশ আবারো জেগে উঠবে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন।
ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, সড়কমন্ত্রী সংসদে একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, এবারের ঈদযাত্রা ছিল স্বস্তির। অথচ বিআরটিএ বলেছে, এবারের ঈদযাত্রায় ১৭০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে, ৩৭০ জন মারা গেছেন। তিনি বলেন, দৌলতদিয়ায় একটি বাস নদীতে ডুবে গেল। এত এত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটল অথচ সড়কমন্ত্রী একটি স্বস্তির বিবৃতি দিলেন। নদীতে বাস ডুবে এত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটল অথচ সড়কমন্ত্রী তাদের দেখতে গেলেন না। নিহত ও আহতদের যে সাহায্য দেয়া হয়েছে সেটি মোটেও কাম্য হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, আর কত মানুষের মৃত্যু হলে সড়কমন্ত্রী অস্বস্তিবোধ করবেন। অনেক দেশেই এ ধরনের ঘটনায় মন্ত্রী নিজের দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। আমাদের সড়কমন্ত্রী সে ধরনের চিন্তা করছেন কি না জনগণ জানতে চায়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, গণভোটের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে গুম-খুনের ‘আয়নাঘর’কে সমর্থন করা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জনগণের আকাক্সক্ষা ও গণভোটকে ইগনোর (উপেক্ষা) করা হলে বাউফল-পটুয়াখালীসহ গোটা বাংলাদেশ আবারো জেগে উঠবে।
ড. মাসুদ বলেন, ‘আজকে সংবিধানের লাইন ধরে ধরে যদি আমাদেরকে চলতে হতো, তাহলে আমাদের নেতৃবৃন্দকে ফাঁসির মঞ্চে যেতে হতো না। সংবিধান যদি আমাদের রক্ষা করতে পারত, তবে ’৭২-এর সংবিধানের আলোকে আজকে আমাদের এখানে থাকার কথা ছিল না। আমি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, আমার এখন জেলখানায় থাকার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘সংবিধান মানতে হলে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে থাকার কথা, উনার দেশের বাইরে থাকার কথা না। জুলাই বিপ্লবের পর যে গণভোটের দাবি উঠেছে, তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আপনারা ৫১ শতাংশের দোহাই দিলেও প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণবিপ্লব ও গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই ৭০ শতাংশ মানুষের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করলে জাতি আবারো জেগে উঠবে। নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, আমার বিরুদ্ধে ৩৫০টি মামলা দেয়া হয়েছিল। সাড়ে চার বছর আমি জেল খেটেছি। তিনবার রি-অ্যারেস্ট করা হয়েছে এবং দুইবার গুম করা হয়েছিল। ডিজিএফআই থেকে আমাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল মন্ত্রিত্ব ও দেশ পরিচালনার ভাগ নেয়ার জন্য, শর্ত ছিল শেখ হাসিনার নীতি ও ’৭২-এর সংবিধান মেনে নিতে হবে। কিন্তু আমরা আপস করিনি।
তিনি আরো বলেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্ট বলেছিলেন, সুযোগ পেলে আমরা এই (’৭২-এর) সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেবো। অথচ আজ বর্তমান সরকারি দলের মধ্যে সেই সংবিধানের প্রতি কেন এত প্রেম জাগ্রত হয়েছে, তা দেশের মানুষ জানতে চায়।
জুলাই বিপ্লবের শহীদদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে ড. মাসুদ বলেন, জুলাই সনদকে যদি আজকে ইগনোর করা হয়, তবে আমাদের আবার সেই গুম-খুনের আয়নাঘরের দিকে ধাবিত করা হবে। গণভোটের বিরোধিতা করা মানে হচ্ছে ৭০ শতাংশ মানুষকে ধিক্কার জানানো। আমরা যদি এই গণভোট কার্যকর না করি, তবে ১৭ বছরের সেই জেল-জুলুমের জায়গায় আমাদের ফিরে যেতে হবে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি জনগণের এই দাবিকে উপেক্ষা করা হয়, তবে আমার নির্বাচনী এলাকা বাউফল বা পটুয়াখালী শুধু নয়, গোটা বাংলাদেশ আবার জেগে উঠে এই গণভোটকে কার্যকর করবে।
এদিকে জয়পুরহাট-১ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য মো: ফজলুর রহমান সাঈদ বলেছেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার সরকারের দাবি জানিয়েছিল। তখন বিএনপি সেটি মানতে অস্বীকার করেছিল। যদিও পরবর্তীতে গণ-আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার কেয়ারটেকার সরকার মানতে বাধ্য হয়েছিল। সেই ইতিহাস আবারো বিএনপি সরকারকে স্মরণ করে দিয়ে তিনি বলেন, আমরা গত ১৭ বছর জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ছাত্র-জনতার জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ সংসদ সদস্য হয়েছি। জুলাই সনদ ও গণভোটে সবাই ঐকমত্য হয়েছি। অথচ সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা জুলাই সনদ সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও বিএনপি সেটি নেয়নি। বিএনপি জুলাই সনদের একটি অংশকে মানছে আর আরেকটি অংশকে অস্বীকার করছে। আমি অনুরোধ জানাবো, বিএনপি যেন জুলাই সনদ ও গণভোটকে মেনে নেয়।
তিনি বলেন, এ দেশের মানুষ জীবন দিতে জানে। তারা জীবন দিয়ে ফ্যাসিস্টদের হটিয়েছে। তারা জানে কিভাবে অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আমার আহ্বান থাকবে, আর যেন রাস্তায় নেমে দাবি আদায়ে জনগণকে জীবন দিতে না হয়। জনগণকে যেন রক্ত দিয়ে রাজপথে নেমে দাবি আদায় করতে না হয়। আমরা সরকারের কাছে সেটিই আশা করব।
ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনে সরকার ও বিরোধী দলের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন কারা দুর্নীতি করছে, কারা টেম্পোস্ট্যান্ড দখল করছে, কারা একজন রিকশাচালক থেকে চাঁদা নিচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। যদি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি চলে, তাহলে ন্যায় ও ইনসাফের রাষ্ট্রগঠন কখনোই সম্ভব হবে না। বক্তব্যে তিনি তার নির্বাচিত এলাকার রাস্তাঘাট পাকাকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতালের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরেন।