মন্ত্রিসভায় ত্যাগী ও অভিজ্ঞরা বাদ পড়ায় দল-জোটে অসন্তোষ
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় একদিকে যেমন তরুণ ও নবীন নেতৃত্বকে তুলে আনা হয়েছে, অন্য দিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কেউ তা স্বীকার করেনি, তবু দলীয় ভেতরে এবং সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এ বিষয়ে বিশেষভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে যে, বিএনপির কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনে রাজপথে ঝুঁঁকি নিয়েছেন, জেল-জুলুম ও অসংখ্য মামলার সম্মুখীন হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন সংগঠন রক্ষা করেছেন যারা তাদের অনেকেই নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।
সূত্র মতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে প্রায় দুই দশক পর এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উৎসবমুখর পরিবেশে শপথ নেন তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার ৪৯ জন সদস্য। নতুন মন্ত্রীদের বরণে দেশের জনগণ উল্লসিত হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে : দলের অভিজ্ঞ ও ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের কোথায় রাখা হলো না?
জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভার প্রায় ৪০ জনই নতুন মুখ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধান হয়েছেন। এটি নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেয়ার কৌশল হিসেবে দেখা হলেও, অভিজ্ঞ নেতাদের বাদ পড়া নিয়ে দলীয়কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং আন্দোলনে অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
বিশেষত, বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম, জাতীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ।
এ নেতারা অতীতে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিলেন। অনেকেই বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাজপথে একাধিকবার রক্তাক্তও হয়েছেন। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য জমির উদ্দিন সরকার এবং স্থায়ী কমিটির একমাত্র নারী সদস্য বেগম সেলিমা রহমান মন্ত্রিসভার তালিকায় নেই।
তৃণমূল নেতাদের মতে, তারেক রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন এবং খালেদা জিয়ার কারাবন্দী সময়ে দলকে সক্রিয় রাখতে এ নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই তাদের বাদ পড়া অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে।
কিছু ত্যাগী নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান না দিলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।
তবে অনেকের মতে, অতীতের পারফরমেন্স অনুযায়ী এ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দায়িত্বে রাখা উচিত ছিল।
মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে মন্তব্য না করাই ভালো।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঘোষণা করেছেন, তিনি আর কখনো মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন না। তিনি বলেন, মন্ত্রী হবো না জেনেই শপথ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমি আর মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করব না। তবে সংসদ সদস্য হিসেবেই জনগণের কথা তুলে ধরব।
নতুন মন্ত্রিসভায় দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও হাফিজ উদ্দিন আহমদ- যিনি পরে স্পিকার হয়েছেন। অন্য দিকে, সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে ড. ওসমান ফারুক, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বরকত উল্লাহ বুলু, লুৎফুজ্জামান বাবর, আমান উল্লাহ আমান মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুকও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এ ছাড়া শামসুজ্জামান দুদু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, হাবিবুন নবী খান সোহেল, সেলিম ভূঁইয়া, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, আজিজুল বারী হেলাল, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমুদ্দিন আলম, রকিবুল ইসলাম বকুলসহ অনেকে বাদ পড়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেয়ার গুঞ্জন ছিল।
দলের ভেতরে আশঙ্কা আছে, দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা নেতারা যদি উপযুক্ত মূল্যায়ন না পান, তবে তা ভবিষ্যতে সংগঠনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূলের কর্মীরা মনে করতে পারেন, কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকার পরও রাজনৈতিক পুরস্কার নিশ্চিত নয়। এতে ভবিষ্যতে আন্দোলনে ঝুঁঁকি নেয়ার আগ্রহ কমতে পারে বা দলীয় কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকার পথ বেছে নেয়া যেতে পারে।
নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন, কিন্তু নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বাদ পড়েছেন।
সাইফুল হক বলেন, এটি পুরোপুরি বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের মাত্র দুই-তিনজনকে রাখা হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় ‘একলা চলো’ নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। যারা দুর্দিনে পাশে ছিল, তাদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন হয়েছে। এর প্রভাব কিছুদিন পর বোঝা যাবে।
মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা উল্লেখ করেছেন, গত ১৫ বছর ধরে তারা নানা নির্দেশনা মেনে রাজপথে ছিলেন। পুলিশি মারধর, মামলা-হামলা, গ্রেফতার আতঙ্ক সত্ত্বেও সভা-সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এখন অনেকের কাক্সিক্ষত দায়িত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, তারেক রহমান তার রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার। সময়ের সাথে সাথে সিদ্ধান্তের ফলাফল স্পষ্ট হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে তারেক রহমান নতুন প্রজন্মভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। তবে অভিজ্ঞ নেতাদের উপেক্ষা করলে দলীয় ঐক্য ও মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে। অন্য দিকে, নতুন নেতৃত্ব দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সরকার পরিচালনায় রূপান্তর একটি জটিল প্রক্রিয়া; এখানে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কেবল ত্যাগের ভিত্তিতে পদবণ্টন সবসময় সম্ভব নয়। তবে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা দলীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।