জ্বালানি নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • ঘাটতি নেই, চাহিদার চেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ রয়েছে : জ্বালানিমন্ত্রী
  • পেট্রলপাম্প ঘুরে নিজের গাড়ির জন্য তেল না পাওয়ায় সংসদে এমপির ক্ষোভ

চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র আলোচনা ও উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্ব, ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ এবং সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই অধিবেশনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই, বরং চাহিদার তুলনায় বেশি মজুদ ও প্রস্তুতি রয়েছে।

গতকাল সোমবার স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে এ আলোচনা হয়। পরে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি ঘাটতি নেই, বরং সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় সরকারের বেশি প্রস্তুতি ও মজুদ রয়েছে। এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্বে একই ধরনের বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ। মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুদ ও প্রস্তুতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা প্রয়োজন ছিল। তিনি আরো বলেন, অযথা আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার কারণে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরকার সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়েছে এবং গত বছরের তুলনায় সরবরাহও বেড়েছে।

পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ডিজেলের মজুদ ছিল দুই লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। এই সময়ের মধ্যে চার লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হলেও মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে। তিনি জানান, চলতি বছরে গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়েনি। বরং অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত মার্চে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন, অকটেন এক হাজার ২০০ এবং পেট্রল এক হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।

চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, যা দৈনিক গড়ে এক হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রল পাম্পের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সেখানে গত বছরের তুলনায় অকটেন বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়েছে।

মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৫ শতাংশই ডিজেল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অকটেন ও পেট্রলের ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের বিষয়টি প্রকৃত সঙ্কট নয়। বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের প্রবণতা থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের কৃত্রিম সঙ্কট মোকাবেলায় তিন হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ১৫৩টি মামলা, ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং দেশীয় উৎস থেকে আরো ৩০ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহ পাওয়া যাবে। এতে করে সরকারের মজুদ অন্তত দুই মাসের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, মার্চ থেকে জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। বৈশ্বিক সঙ্কটের মধ্যেও পরিবহন, শিক্ষা ও শিল্পকারখানা সচল রাখতে সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ দিকে সম্পূরক আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো: আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি কয়েকটি পেট্রল পাম্প ঘুরেও নিজের গাড়ির জন্য জ্বালানি পাননি। তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান একই দলের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তার নির্বাচনী এলাকায় পাম্পে তেল না থাকলেও বাইরে বোতলে করে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে, ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বলেন, জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়াতে সরকার একাধিক দেশের সাথে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলো ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে।

সংসদীয় কমিটির হুঁশিয়ারি

জাতীয় সংসদের কেনাকাটায় অতীতে আলোচিত ‘বালিশ, পর্দা ও ছাগল কাণ্ড’-এর মতো বিতর্কিত ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। একই সাথে সংসদ অধিবেশনে সাউন্ড সিস্টেম বিকল হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে এবং ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ মো: নূরুল ইসলাম। বৈঠকে কমিটির সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চিফ হুইপ জানান, সংসদের আসবাবসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং ক্রয়মূল্য যুক্তিসঙ্গত রাখার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, সংসদ এলাকায় সুপেয় পানির সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং খুব শিগগিরই সংসদ সদস্যরা তাদের নির্ধারিত বাসভবনে উঠতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সংসদ অধিবেশনে সাউন্ড সিস্টেম বিকল হওয়ার বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, এটি নাশকতা কি না তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সাউন্ড সিস্টেম পুরোপুরি সচল না থাকায় বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই কাজ চালাতে হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের ঘটনায় সাউন্ড সিস্টেমে নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে এবং এ কারণে প্রথম অধিবেশনেই প্রধানমন্ত্রীকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে বক্তব্য দিতে হয়েছে, যা নজিরবিহীন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সংসদ সদস্যদের জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নাখালপাড়ায় অবস্থিত ভবনসমূহের সংস্কার ও মেরামত কাজের অগ্রগতি, শেরেবাংলা নগরের এমপি হোস্টেলের অফিস কক্ষ বরাদ্দ, সংসদের মেডিক্যাল সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, আবাসিক ভবনে নিরাপত্তা জোরদারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনা শেষে সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটি চিহ্নিত করতে রকিবুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া সংসদ ভবনের ক্যান্টিনের খাবারের মান, পানির গুণগত মান এবং সংসদ সদস্যদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের মান যাচাইয়ের জন্য নায়াব ইউসুফ আহমেদকে আহ্বায়ক করে আরেকটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে।