আবু সাঈদ হত্যা : ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন রোববার

তদন্তে ৩০ জনের সম্পৃক্ততা, ৪ আসামি কারাগারে

বহুল আলোচিত এ ঘটনায় আগামী রোববার ট্রাইব্যুনাল-২ এ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
আবু সাঈদ
শহীদ আবু সাঈদ | সংগৃহীত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় আগামী রোববার ট্রাইব্যুনাল-২ এ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর মো: মিজানুল ইসলাম। তিনি জানান, মামলার তদন্তে ৩০ জন ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর, পুলিশের সদস্য এবং ছাত্রলীগের নেতাসহ চারজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রকে গুলি : ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চরম উত্তেজনার সময়, রংপুরে অনুষ্ঠিত এক শান্তিপূর্ণ মিছিল থেকে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।

ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। সেই মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাঈদ। ওই দিন বিকেল ২টা ১৭ মিনিটে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাঈদ ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক।

তদন্তে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ : তদন্ত সংস্থা গত ২৪ জুন চূড়ান্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেয়। এতে বলা হয়, আবু সাঈদের মৃত্যুর জন্য তৎকালীন প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কিছু সদস্যের ভূমিকা ছিল ‘সাংগঠনিক, নির্দেশনামূলক ও সরাসরি’। যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন, প্রক্টর শরিফুল ইসলাম (বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর); এএসআই আমির হোসেন (সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক); সুজন চন্দ্র রায় (সাবেক কনস্টেবল); ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ (তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা)।

এদের সবাইকে ইতোমধ্যেই অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রসিকিউটর জানান, বাকি ২৬ জনের নাম এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না তদন্তের স্বার্থে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু : আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী, গত বছরের ১৮ আগস্ট ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ১৩ জানুয়ারি তিনি ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন।

চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এম তাজুল ইসলাম ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলাটি গ্রহণ করেন। মামলার নম্বর ‘আইসিটি-বিডি কেস নং: ১২/২০২৫’।

আন্দোলনের বিস্তার এবং সরকারের পতন : আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সড়কে, গ্রামে-গঞ্জে ও শহরে। পরদিন থেকেই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এ আন্দোলনে অন্তত ৮৫০ জন নিহত হন, আহত হয় হাজার হাজার। ১৯ জুলাই দেশব্যাপী কারফিউ জারির পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন।

ইতিহাসে প্রতীক হয়ে ওঠা একটি মৃত্যু : আবু সাঈদ হয়ে ওঠেন এই গণ-আন্দোলনের প্রতীক। তার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি আন্দোলনের ‘চেতনাপতাকা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে দেশে-বিদেশে।

তার গ্রামের নাম বাবনপুর, পীরগঞ্জ, রংপুর। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বাদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। সহপাঠীরা জানান, তিনি ছিলেন ‘অত্যন্ত নির্ভীক, দায়িত্বশীল ও নীতিগতভাবে অটল’।