আইএমএফের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে সরকারের না

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চায় সরকার বিদ্যুতের ভর্তুকি শূণ্যতে নামিয়ে আনুক। এজন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হোক। কিন্তু এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। বাড়বে জনদুর্ভোগ। এ কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার নারাজ। এজন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের আজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যুতের ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা জানানো হবে আইএমএফকে। বিদ্যুৎ বিভাগের এক দায়িত্বশীল সূত্র গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারতের আদানিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানির সাথে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অসম চুক্তি করেছিল বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে বিদ্যুতের ভর্তুকি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় নেতাকর্মীদের লাভবান করতে একদিকে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাড়ানো হয়, পাশাপাশি দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে বাড়তি মূল্য কোম্পানিগুলোর পকেটে দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের ভর্তুকি বেড়ে হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। ৫ আগস্টের পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিদ্যুৎ খাতের অসঙ্গতিগুলো দূর করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর এজন্য বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েই ২৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের জন্য। অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আদানি পাওয়ারের সাথে কয়লা মূল্য নির্ধারণের সূত্র সংশোধন করা, যার ফলে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ ক্রয়ে প্রায় ১১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও, তিনটি যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র- বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি, বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি এবং আরপিসিএল-নোরিনকো পাওয়ার প্ল্যান্টকে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির জন্য তাদের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) তে অসঙ্গতি পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এনডব্লিউপিজিসিএল, এপিএসসিএল, ইজিসিবি, আরপিসিএল এবং বিআরপিএলের মতো প্রতিষ্ঠানের অধীনে ২৩টি রাষ্ট্র পরিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে তাদের পিপিএ পুনর্মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। শুধু এই পদক্ষেপের মাধ্যমেই বার্ষিক ২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, সরকার এই সংস্কারের মাধ্যমে সব মিলে ২০২৬ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৭৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করার আশা করছে। এভাবেই ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এদিকে আইএমএফ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি শূণ্যতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে। আইএমএফের মতে, ভর্তুকি শূণ্যতে নামিয়ে আনতে হলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ ক্রয়ে নানা অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার করা হলে বিদ্যুতের দাম আর বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। ধাপে ধাপে আগামী তিন বছরের জন্য বিদ্যুতের ভর্তুকি কমিয়ে আনার জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে। আজ আইএমএফের সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের বৈঠকে এ রোডম্যাপ তুলে ধরা হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং খুচরা মূল্যের মধ্যে ব্যবধান কমাতে তিন বছরের সংস্কার রোডম্যাপের (অর্থবছর ২৬-২৮) অংশ হিসেবে, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি ২৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তিনি আরো বলেন, যে কোনো শুল্ক সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের উপর ছেড়ে দেয়া হবে। বর্তমানে, বিদ্যুতের পাইকারি শুল্ক প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৭.০৪ টাকা, যেখানে সরবরাহ খরচ ১২.১৫ টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা শুল্ক প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৮.৯৫ টাকা, অতিরিক্ত ২০ শতাংশ চাহিদা চার্জ এবং অন্যান্য বিভিন্ন ফি সহ। আইএমএফ প্রতিনিধিদল আগামী ১ জুলাই পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে বৈঠক করবে। সফরকালে সরকার গত ৯ মাসে ভর্তুকি হ্রাস এবং খাতে আর্থিক দক্ষতা উন্নত করার জন্য গৃহীত সংস্কার ব্যবস্থা সম্পর্কে আইএমএফকে অবহিত করবে।