মূল্যবৃদ্ধির সাথে মজুরি বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারছে না

জিইডির প্রতিবেদন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির সাথে মজুরি বৃদ্ধি পুরোপুরি তাল মেলাতে পারছে না। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্য দিকে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি সামান্য বেড়েছে, যার প্রধান কারণ চাল এবং প্রোটিনজাতীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, এ ছাড়া শাকসবজি কিছুটা স্বস্তি প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক আপডেট এবং আউটলুকে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বহিঃস্থ খাত গতিশীল হওয়ার লক্ষণ দেখিয়েছে, অন্য দিকে ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নভেম্বর মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৯% হয়েছে, যা অক্টোবরে ৮.১৭ শতাংশ ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৩৬ শতাংশ হয়েছে, যেখানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। গত বুধবার এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

বলা হয়, যদিও চালের মূল্যস্ফীতি সকল বিভাগে স্পষ্টভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে, অক্টোবরে ১৩.৭৭ শতাংশ থেকে নভেম্বরে ১২.২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, তবুও এটি উচ্চতর পর্যায়ে রয়েছে এবং খাদ্যের দামের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। এ সময়ে মাঝারি চালের মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ১০.৯৬ শতাংশ এবং মিহি চালের মূল্যস্ফীতি ছিল ১৫.৪৩ শতাংশ এবং মোটা চালের ১১.০৪ শতাংশ। নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে চালই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে, যা ছিল ৪০.২৮ শতাংশ।

প্রোটিনজাতীয় পণ্যের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঁচা মাছ এবং শুঁটকি মাছের সম্মিলিত অবদান বেড়ে ৪০.৭৭ শতাংশ হয়েছে, অন্য দিকে গরুর গোশত, ইলিশ এবং পাঙ্গাস মাছের অবদানও অক্টোবরের তুলনায় বেশি হয়েছে আলোচ্য সময়ে। শাকসবজি একটি শক্তিশালী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা পালন করে চলেছে, যদিও প্রভাবের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। তাদের নেতিবাচক অবদান এক মাস আগে ২০.৫৭ শতাংশ থেকে ১৭.৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আলু এবং পেঁয়াজের দাম তীব্র মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে রয়ে গেছে।

মজুরি বৃদ্ধি দামের তুলনায় পিছিয়ে : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে ব্যবধান সঙ্কুচিত হয়েছে, কিন্তু নভেম্বরে আবার কিছুটা প্রসারিত হয়েছে। এ সময়ে ৮.২৯% মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি মুদ্রাস্ফীতি ৮.০৪% থাকার কারণে প্রকৃত আয় চাপের মধ্যে রয়েছে। যদিও তুলনামূলকভাবে সঙ্কীর্ণ ব্যবধান মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমে কিছু আংশিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

বহিঃস্থ খাত ব্যাংকিং স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করে : বাংলাদেশের বহিঃস্থ খাত গতিশীলতা অর্জনের লক্ষণ দেখিয়েছে, যা শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সামান্য রফতানি প্রবৃদ্ধির দ্বারা সমর্থিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ দিকে স্থিতিশীল আমানত সম্প্রসারণের দ্বারা ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল ছিল।

অক্টোবরে ব্যাংক আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা বছরে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এতে ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থার প্রতিফলন দেখা যায়। তবে একই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে মাঝারি রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। অক্টোবরে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি সেপ্টেম্বরে ১০.২০% থেকে কমে ৯.৬২% হয়েছে, বেসরকারি খাতের ঋণের তুলনায় সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।

ব্যাংকভেদে সুদ হারের স্প্রেড (ঋণ-আমানতের সুদের ব্যবধান) : অক্টোবরে ব্যাংকিং গ্রুপভেদে গড় সুদের হার স্প্রেড উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ স্প্রেড ৮.৮৮% রেকর্ড করেছে, যেখানে বিশেষায়িত এবং উন্নয়ন ব্যাংকগুলো সর্বনিম্ন ৩.৩৭% রেকর্ড করেছে যা তাদের ছাড়মূলক এবং ম্যান্ডেট-চালিত কার্যক্রমকে প্রতিফলিত করে। রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রায় ৫.৬% এ একই স্প্রেড দেখিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকখাতে প্রায় ৫% এর স্প্রেড কাম্য, কারণ এটি ব্যাংকিং খাতে উন্নত দক্ষতার ইঙ্গিত দেয় এবং লাভজনকতা এবং ঋণ খরচের ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা, বিলম্বিত অনুমোদন এবং ধীরগতির অর্থ ছাড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে উন্নয়ন ব্যয় সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আলোচ্য সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সাথে প্রবাসী আয় প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রফতানি আয়ও স্থিতিশীল রয়েছে, যদিও এর বড় অংশ এখনো তৈরী পোশাক খাতনির্ভর।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও রফতানি আয়ে পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রফতানি বৈচিত্র্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ।