দখল ও বর্জ্যে রুদ্ধ খালের পানি

সামান্য বৃষ্টিতেই রূপগঞ্জে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা

Printed Edition

শফিকুল আলম ভূঁইয়া রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় খাল দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও শিল্পবর্জ্যরে কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বছরের পর বছর এ ভোগান্তি চললেও খাল উদ্ধার বা পুনঃখননে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

কাঞ্চন পৌরসভা, ভুলতা, গোলাকান্দাইল ও মুড়াপাড়া ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের প্রায় দুই হাজার একর জমি ঘিরে গড়ে ওঠা বেড়িবাঁধের ভেতরের এলাকায় এ সমস্যা আরো প্রকট রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোথাও ছয় মাস, কোথাও সারা বছরই পানি জমে থাকে। ফলে এ এলাকায় প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে।

জানা যায়, ১৯৮১ সালে জাইকার সহায়তায় “নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী সেচ প্রকল্প (ব্লক-১)” এর আওতায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে এ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। তখন এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫টি খাল খনন এবং বানিয়াদী স্লুুইসগেটসহ চারটি সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই অবকাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটাব-বারৈপাড়া এলাকার কানি বিলের পিঠাগুড়ি অংশে খালের ওপর বাগানবাড়ি নির্মাণ করায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদী থেকে টাটকি, সুতালরি, দাগিরমার ও কালাদী হয়ে গোলাকান্দাইল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সরকারি খালের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে গেছে। কোথাও বালুর গদি, কোথাও শিল্পকারখানা, আবার কোথাও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে খালের ওপরে বা পাশে। ১৮০ ফুট এশিয়ান হাইওয়ে (ঢাকা বাইপাস) সম্প্রসারণের সময়ও খালের অংশবিশেষ ভরাট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এতে একদিকে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্য দিকে বালুর গদি ও বর্জ্যে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে তৈরি হচ্ছে জলাশয়, আর ভারী বর্ষণে তা ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় রূপ নিচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলার কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

হাটাব এলাকার বাসিন্দা শরীফ মিয়া বলেন, ‘প্রশাসন মাঝে মাঝে এসে জরিমানা করে চলে যায়, যেন জরিমানা করাটাই তাদের একমাত্র কাজ। কিন্তু খালগুলো নদীর সাথে সংযোগ করার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয় না।’ তিনি জানান, জলাবদ্ধতায় শত শত মাছের ঘের ডুবে গিয়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

শ্যামল দাস বলেন, আগে খালের মাধ্যমে পানি বানিয়াদী স্লুইসগেটে গিয়ে পাম্পের সাহায্যে শীতলক্ষ্যায় ফেলা হতো। এখন খাল দখল হয়ে যাওয়ায় সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকে।

নরাবের টেক এলাকার সবুজ মিয়া অভিযোগ করেন, এশিয়ান হাইওয়ে সম্প্রসারণের সময় ড্রেজিংয়ের বালু ফেলে খাল ভরাট করা হয়েছে। কোথাও কোথাও খালের ওপরই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যা জলাবদ্ধতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহমেদ বলেন, খাল খনন ও পুনরুদ্ধারে শিগগিরই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামও জানান, দখল উচ্ছেদে অভিযান চলমান রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে তেতলাবো, উকিলবাড়ি ও বানিয়াদী- এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খাল পুনরুদ্ধার ও সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হলে রূপগঞ্জের এই বিস্তীর্ণ জনপদে জলাবদ্ধতা আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।