মাদরাসার শিক্ষাকাঠামোর সঙ্কট, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
দ্বৈতভর্তি নীতিতে দুই নৌকায় পা দিচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী
অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই চান সন্তানরা ছোটকালে মাদরাসায় পড়ে ভালো আলেম কিংবা হাফেজ হয়ে তার পর বড় হয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বড় অফিসার হবে।
Printed Edition
মাদরাসায় পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই এখন উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের আশায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করছেন। দ্বৈতভর্তি নীতিতে দুই নৌকায় পা দেয়ার এই প্রবণতা প্রায় সব শিক্ষার্থীর মধ্যেই দেখা যায়। অভিভাবকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন সন্তানকে অন্তত আরবি লাইনে পড়াশোনা করিয়ে এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা এগিয়ে নিতে হবে। এ যেন সব কুল রক্ষা করার আয়োজন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার এই উভয় লাইনে যারা পড়াশোনা করে উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তাদের বেশির ভাগই কোনো লাইনেই ভালো কিছু করতে পারছেন না। ফলে দুই কুলই হারিয়ে বাস্তব জীবনে কোনো মতে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে মাদরাসা ও কারিগরি বিভাগের উদ্যোগে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে (আমাইতে) দিনব্যাপী মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে এক সেমিনারে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের এই দ্বৈতভর্তি নীতির বিষয়টি উঠে আসে। সেমিনারে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক তার এক গবেষণায় শিক্ষার্থীদের দ্বৈতভর্তির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে কোনো একজন শিক্ষার্থী মাদরাসা হোক কিংবা সাধারণ শিক্ষায় হোক তিনি ভালো করতে পারলে তার জন্য যেকোনোটিই উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের জন্য কাজে আসবে। কিন্তু দুই লাইনে পড়াশোনা করার পরও অনেকে কোনো লাইনেই ভালো করতে পারে না। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে।
গ্রামের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই চান সন্তানরা ছোটকালে মাদরাসায় পড়ে ভালো আলেম কিংবা হাফেজ হয়ে তার পর বড় হয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বড় অফিসার হবে। ফলে ছোট বয়সে সন্তানকে মাদরাসায় (হোক সেটা আলিয়া কিংবা কওমি) পড়িয়ে একটু বড় হলে তারা তাদের সন্তানকে কলেজে পড়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আবার যারা মাদরাসা ছাড়তে চান না তাদের মধ্যে অনেকেই আবার মাদরাসার পাশাপাশি স্কুলে বা কলেজেও ভর্তি হয়ে থাকেন। এক বা দুই বছরের গ্যাপ দিয়ে তারা সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদরাসা বোর্ড থেকেই অতিরিক্ত দাখিল কিংবা আলিম পাস করতে তৎপর হন। অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মাদরাসা পর্যায়ের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ (কিছু ক্ষেত্রে এক শ’ ভাগ) শিক্ষার্থী দ্বৈতভর্তির এই নীতি অবলম্বন করে দুই নৌকায় পা দিয়ে দুই ধরনের সার্টিফিকেটই সংগ্রহ করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের দ্বৈতভর্তি নীতির এ সুযোগটি সরকারিভাবেই শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে দাখিল ও আলিমের পাঠ্যবই ও সিলেবাস পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, আরবি সাহিত্য এবং কুরআন ও হাদিস রিলেটেড দু-একটি সাবজেক্ট বাদে অন্যান্য সব বিষয় এবং সিলেবাসই থাকে অভিন্ন। ফলে একজন শিক্ষার্থী দাখিলে যে সিলেবাসে পড়াশোনা করছে এসএসসিতেও ঠিক সেই একই সিলেবাস অনুসরণ করে সহজেই সে এসএসসিও পাস করতে পারছে। ঠিক একই অবস্থা আলিম অথবা এইচএসসিতেও। এমনও হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত সহজ বিষয়ের শিক্ষার্থীরা মাদরাসা থেকেও কামিল কিংবা এই রিলেটেড একাধিক ডিগ্রি অর্জন করছেন সহজেই।
গত কয়েক দিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে এসব বিষয়ে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এর অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা। শিক্ষার্থীরা সবাই অকপটেই এ কথা স্বীকার করেছেন যে, কলেজে কিংবা মাদরাসায় হোক ভর্তি জটিলতায় সময়ক্ষেপণের কারণে তারা একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে থাকেন। এ ছাড়া সেশনজটের আশঙ্কায় তারা কেউ কলেজে আবার কেউ আলিমে উভয় শ্রেণীতেই ভর্তি হয়ে থাকেন। এরপর সুবিধামতো যেখানে আগে সম্ভব সেখানেই পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট অর্জনের চেষ্টা করেন।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা আলিম কিংবা ফাজিল পাস করার পরও চাকরির প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কেউ মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন পদে কর্মজীবন শুরু করেন। আবার কেউ কেউ জীবিকার তাগিদেই ছোট ব্যবসা কিংবা মোবাইল সার্ভিসিং বা কম্পিউটার কম্পোজের বা ফটোকপির দোকান দিয়ে বসেন। ব্যবসার বাইরে অনেক অলস সময় থাকায় অনেকে আবার কলেজে ভর্তি হয়ে মাদরাসা লাইনের বাইরের আরো কিছু সার্টিফিকেট অর্জনের চেষ্টা করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাদরাসা ও কারিগরি বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইমলাম মনে করেন, শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনা শেষ করে তার কর্মদক্ষতা অনুযায়ী কাজের বা চাকরির নিশ্চয়তা পান তাহলে নির্দিষ্ট একটি লাইনেই তিনি পড়াশোনা করতে আগ্রহী হবেন, স্বাচ্ছন্দ্যবোধও করবেন। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাকাঠামো বা শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও চাকরির বাজারে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চাহিদা তৈরি করতে পারছে না। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার চিন্তা করা হচ্ছে। এখানে কারিগরি শিক্ষাকে সব সেক্টরেই বাধ্যতামূলক করার চিন্তা করা হচ্ছে। স্কুল, কলেজের সিলেবাসে এমনকি মাদরাসার সিলেবাসেও কর্মমুখী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক তার এক গবেষণায় তিনি আরো জানান, আগামী দিনে আমাদের নতুন প্রজন্ম এমন বাংলাদেশে গড়ে তুলবে যেখানে একজন শিক্ষিত যুবক মানেই হবেন একজন প্রশিক্ষিত কর্মী। আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দানের পাশাপাশি তাদেরকে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলেই এই দ্বৈতভর্তির কোনো সুযোগ থাকবে না। সুযোগ থাকলেও কোনো একজন শিক্ষার্থী তার ডিসিপ্লিনের বাইরে গিয়ে বাড়তি কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করে নিজের মূল্যবান সময়ই নষ্ট করতে চাইবে না।