যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে ওয়াশিংটনে লেবানন-ইসরাইল বৈঠক

Printed Edition

এএফপি ও টাইমস অব ইসরাইল

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মাঝে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতার ল্েয ওয়াশিংটন ডিসিতে দ্বিতীয় দফার ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা শুরু হচ্ছে। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠককে কেন্দ্র করে উভয় পই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে।

লেবানন সরকার বর্তমানে কার্যকর থাকা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো এক মাস বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই সংলাপ কয়েক দশকের মধ্যে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রথম কোনো সরাসরি আলোচনা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আগামী রোববার বর্তমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাওয়ার প্রোপটে এই কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈঠকের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে পারে সীমান্ত পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ।

বৈরুত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লেবাননের প্রতিনিধিদল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ এক মাস বাড়ানোর পাশাপাশি ইসরাইলি বাহিনীর বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানাবে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বুধবার এক ভাষণে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করতে সব পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যদি এই মেয়াদ বৃদ্ধি পায়, তবে পরবর্তী ধাপে লেবানন বিতর্কিত স্থল সীমান্ত নির্ধারণ, ইসরাইলে আটক লেবাননি নাগরিকদের মুক্তি এবং দণি লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বড় বিষয়গুলো নিয়ে দরকষাকষি করবে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সারও এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, লেবাননের সাথে তাদের কোনো বড় বিরোধ নেই এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই দুই দেশেরই অভিন্ন ল্য হওয়া উচিত।

কূটনৈতিক এই আশাবাদের মধ্যেই দণি লেবাননের রণাঙ্গনে উত্তেজনা কমেনি। বুধবার ইসরাইলের স্বাধীনতা দিবস চলাকালেও হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলি প্রতিরা বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ দণি লেবাননে মোতায়েন করা সেনাদের ল্য করে একটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা আকাশ প্রতিরা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছে। আইডিএফ একে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর আগে মঙ্গলবারও হিজবুল্লাহ রকেট হামলা চালিয়েছিল এবং জবাবে ইসরাইল একটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করার পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রম করা দুই হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে। হিজবুল্লাহ অবশ্য জানিয়েছে, তারা কেবল ইসরাইলি লঙ্ঘনের জবাবেই এই ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এক ভাষণে লেবাননের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের স্বপ্ন প্রকাশ করে বলেছেন, তার স্বপ্ন হলো একদিন সরাসরি গাড়ি চালিয়ে বৈরুতে যাওয়া এবং সেখানকার মানুষের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথে হিজবুল্লাহর সশস্ত্র উপস্থিতি একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সাথে গৃহযুদ্ধে জড়াতে চান না বলে স্পষ্ট করলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রায় শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। গত ২ মার্চ শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাত গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা থিতু হলেও পূর্ণাঙ্গ শান্তি এখনো সুদূর পরাহত। ওয়াশিংটনের বৈঠকটি এখন সেই অনিশ্চয়তা কাটানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসরাইলি হামলায় সাংবাদিকসহ নিহত ৫

এদিকে আলজাজিরা জানায়, দণি লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলায় এক নারী সাংবাদিকসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এই হামলার ঘটনা অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

গত বুধবার এনএনএর প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরাইল প্রথমে দণি লেবাননের আত-তিরি গ্রামে একটি গাড়ি ল্য করে হামলা চালায়। এতে গাড়িতে থাকা দুই আরোহীর মৃত্যু হয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা দণি লেবাননে দু’টি যানবাহনে হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, গাড়ি দু’টি হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত একটি সামরিক স্থাপনা থেকে বের হয়েছিল। এনএনএ আরো জানায়, পরবর্তীতে একই গ্রামের একটি ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলায় দুইজন সাংবাদিক আহত হন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘আল আখবার’-এ কর্মরত সাংবাদিক আমাল খলিলকে পরে ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে তার কর্মস্থল থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

দণি লেবাননের টায়ার থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হেইডি পিট জানান, আত-তিরি গ্রামে প্রথম হামলার পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল আখবারের দুই সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পিট তার প্রতিবেদনে আরো লেখেন, ‘আত-তিরি গ্রামে একটি গাড়িতে ইসরাইলি ড্রোন হামলার পর আমাল খলিল ও জয়নাব ফারাজ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ওই হামলায় দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।’ কিছুণ পর সেখানে একটি ভবনে হামলায় ওই দুই সাংবাদিক আহত হন এবং ভবনের ধ্বংসস্তূপ নিচে চাপা পড়েন। পিট জানান, ‘কয়েক ঘণ্টা ধরে রেডক্রস ও উদ্ধারকর্মীরা ওই দুই সাংবাদিকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেখানে ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকার কারণে উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যেতে সম হয়নি।’

পরে জয়নাব ফারাজকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার অবস্থা ‘সঙ্কটাপন্ন’ বলে জানানো হয়েছে। তার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন পিট। এর আগে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইল ওই সাংবাদিকদের ‘অনুসরণ’ করেছে এবং তারা যে ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ভবনকে হামলার ‘ল্যবস্তু’ করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স যেন দুই আহত সাংবাদিকের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য ইসরাইল আত-তিরির সাথে হাদ্দাথার সংযোগকারী প্রধান সড়ক ল্য করেও হামলা চালিয়েছে বলে জানান পিট। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তারা সাংবাদিকদের ল্যবস্তু করে না এবং তাদের তি কমানোর জন্য পদপে নেয়।’ একই সাথে তারা আত-তিরি হামলার ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারীদের পৌঁছতে বাধা দেয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে।

অথচ গত মাসেও দণি লেবাননে স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা একটি গাড়িতে ইসরাইলি হামলায় তিনজন সাংবাদিক নিহত হন। এনএনএর খবরে বলা হয়, বুধবার দণি লেবাননের ইয়োহমোর আল-শাকিফ শহরে ইসরাইলের আরেকটি হামলায় দুজন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে।