জুলাই যোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় নেতা

নতুন ফ্যাসিবাদের পরিণতি আ’লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে

Printed Edition
first-2
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ১১ দলীয় ঐক্য জোট আয়োজিত জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদে টু-থার্ড মেজরিটির ক্ষমতা বলে বিএনপি গায়ের জোরে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করে বিএনপি নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার নিজেরাই লঙ্ঘন করেছে। আওয়ামী লীগের পর নতুন করে যারা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে।

গতকাল রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা হলরুমে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সাথে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, সংসদের ভেতরে যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারব, কথা বলতে পারব, তত দিন সংসদে থাকব। লড়তে না পারলে, কথা বলতে না পারলে এক মিনিটও থাকব না। যখনই বিএনপি সরকার গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ, দুদক অধ্যাদেশ, পুলিশ অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করেছে, তাৎক্ষণিক আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে ঘৃণার সাথে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি। ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিএনপি দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়ায় আমরা এক মুহূর্তের জন্যও সংসদে থাকিনি; সাথে সাথে ওয়াকআউট করেছি।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আগামীতে চূড়ান্তভাবে পরাজয় হবে ফ্যাসিবাদের, বিজয় হবে জনগণের। সেই চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এক পা কেটে ফেলার পরও জুলাই যোদ্ধার অনুভূতি-প্রয়োজন হলে পুরো শরীরই দেবো! কিন্তু জুলাই কাউকে ছিনিয়ে নিতে দেবো না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদকে সরকার উপেক্ষা করছে। সরকারের প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম গণভোটও সংবিধানে ছিল না। সংবিধান যদি জনগণের জন্য হয়, তবে জনগণের ম্যান্ডেট মেনেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে জুলাই সনদ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের পক্ষে কাজ করলে আমরা সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করব। কিন্তু সরকার জনগণের বিপক্ষে গেলে আমাদের ফাঁসিতে ঝুলালেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে আমরা পিছু হটব না।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ কার্যত ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এ দেশে খুনের রাজনীতি শুরু করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা খুন, গুম, গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগের পর নতুন করে যারা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে।

সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে সংস্কারের মাধ্যমেই পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি সরকার। আমরা মনে করি, জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা জুলাইকে রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি, করবও না। বিএনপি জুলাইকে রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। সরকার নিজেদের কাজের বৈধতার জন্য কখনো একাত্তর, কখনো চব্বিশকে ব্যবহার করছে। বিএনপি কোনো আন্দোলনে ছিল না; তারা কেবল আন্দোলনের ফসল ভোগ করেছে। বিএনপি জুলাই সনদ কিংবা নিজেদের ইশতেহারের ৩১ দফার কোনোটিই পালন করছে না। যার কারণে তারা সর্বস্তরে দলীয়করণের মিশনে নেমেছে। তারা সংস্কারের কথা মুখে বললেও কাজে তার কোনো প্রমাণ নেই; বরং তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের সব কালো আইন-কানুন ও নিয়মনীতি বহাল রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে। আজকের এই মতবিনিময় আমাদের করণীয় নির্ধারণের জন্য। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পরামর্শে আমরা তা নির্ধারণ করতে পেরেছি। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজপথে নামব। এবার আংশিক নয়, পরিপূর্ণ সফলতার জন্যই রাজপথে নামব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার কর্তৃক সৃষ্ট চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করার লক্ষ্যে আজকের এই মতবিনিময় সভা। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তাতে আমাদের করণীয় নির্ধারণ সহজ হয়েছে। আমরা জাতির স্বার্থে আপসহীনভাবে নিঃস্বার্থ ভূমিকা অব্যাহত রাখব। এ জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক, সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জাতির সাথে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

শহীদ আলিফের পিতা গাজীউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ যা করতে দুই বছর নিয়েছিল, বিএনপি তা দুই মাসেই করেছে। জুলাইয়ের সেøাগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস (আমরা ন্যায়বিচার চাই)’, কিন্তু সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি ও চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়েছে। আরেকটি সেøাগান ছিল ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’; অথচ বর্তমান সরকার মেধা ও কোটা- দুটোই উপেক্ষা করে পরিবারতন্ত্র কায়েম করছে।

শহীদ মেহেরুন নেছার পিতা মোশারফ হোসেন স্পিকারের সমালোচনা করে বলেন, স্পিকার একাত্তরের যোদ্ধা, আর হাসনাত আবদুল্লাহরা জুলাই যোদ্ধা। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের কারণেই স্পিকার হতে পেরেছেন। তাই জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে স্পিকারসহ সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সংসদ সচিবালয় ঘেরাও করা হবে।

শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ বলেন, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়া। সেই স্বপ্ন ও চেতনার প্রতিফলন রয়েছে জুলাই সনদে। কিন্তু তা উপেক্ষা করে পুরনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা আমরা মেনে নিতে পারি না।

জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গণভোটে জনগণের রায় পাওয়ার পরও বিএনপি তা মানছে না। জুলাই সনদ থেকে একটি দাঁড়ি বা কমাও বাদ দেয়া যাবে না। জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান গণভোট, গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের তীব্র নিন্দা জানান।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেনের যৌথ পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় আরো বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামুল বসির, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রমুখ। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে আরো বক্তৃতা করেন, শেখ জামাল হোসেন, সানজিদা খানম দ্বীপ্তি, লাখী বেগম, শহিদুল ইসলাম, কবির হোসেন, তাজুল ইসলাম প্রমুখ।