কাঠের ব্যাংক : নূরুল ইসলাম মনি

Printed Edition
agdum3
কাঠের ব্যাংক : নূরুল ইসলাম মনি

একদিন ইমতিয়াজ তার আব্বুকে বলল, ‘আব্বু আমাকে একটি কাঠের ব্যাংক বানিয়ে দিতে হবে’। আব্বু বলল, ‘বানাতে হবে কেন? ব্যাংক তো দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। মাটির ব্যাংক,প্লাস্টিকের ব্যাংক। সব ব্যাংক পাওয়া যায়। যেকোনো একটি কিনে আনলেই তো হবে।’

‘না। দোকানের ব্যাংকগুলো ছোট ছোট। ওগুলো দিয়ে আমার হবে না। আমার লাগবে বড় ব্যাংক।’

‘কেন? বড় ব্যাংক কেন?’

‘ছোটো ব্যাংকে বেশি টাকা ধরে না। অল্প সময়েই ওটা ভরে যায়। তাই আমার বড় ব্যাংক দরকার। বড় ব্যাংকে সারা বছর ধরে অনেক টাকা জমিয়ে ঈদের সময় সেই টাকা দিয়ে এলাকার সব গরিব ছেলেমেয়েদেরকে আমি কাপড়চোপড় কিনে দেবো।’ ইমতিয়াজের আব্বু ইমরান সাহেব ছেলের মুখে এমন জনসেবার কথা শুনে খুব খুশি হলেন। বললেন, ‘বাহ! ফাইন আইডিয়া। আমি আজকেই ফার্নিচারের দোকানে গিয়ে তোমার জন্য একটি ব্যাংক তৈরির অর্ডার দিয়ে আসব।’

কয়েক দিন পরে ইমরান সাহেব নির্বাচনের ব্যালট বাক্সের মতো একটি সুন্দর কাঠের ব্যাংক নিয়ে এসে ইমতিয়াজের হাতে বুঝিয়ে দিলেন।

ইমতিয়াজ আনন্দে লাফাতে লাফাতে তার মাকে গিয়ে বলল, ‘আম্মু এই দেখো আমার কত্ত বড় ব্যাংক। এই ব্যাংকে টাকা জমিয়ে আমি জনকল্যাণে ব্যয় করব। গরিব দুঃখী শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কাজ করব।’

ইমতিয়াজের মা বলল, ‘তুমি অত টাকা কোথায় পাবে বাপজান?’

‘কেন? আমার টিফিনের টাকা থেকে বাঁচাব। আমার হাতখরচের টাকা থেকে বাঁচাব। আমি সারা বছর কত টাকা খরচ করি। এখন থেকে আর এক টাকাও খরচ করব না। সব টাকা এই ব্যাংকে ঢুকাব।’ ‘আমার চাচ্চু ফুপ্পি খালামনিরা সময়ে সময়ে আমাকে কত্ত টাকাপয়সা দেয়, এখন থেকে ওগুলো আর খরচ করব না। আমার ব্যাংকে জমাব। তাছাড়া তুমি কিছু কিছু দেবে, আব্বু দেবে- এসব টাকা আমি আমার এই কাঠের ব্যাংকে ঢুকাব।’ ‘তুমি সর্ব প্রথম তোমার নিজ হাতে আমার এই ব্যাংক উদ্বোধন করে দাও এবং দোয়া করে দাও যেন আমার এই উদ্দেশ্য সফল হয়। আমার এই কাঠের ব্যাংক গরিব শিশুদের কল্যাণের প্রতীক হয়ে ওঠে।’ ইমতিয়াজের মা রেহানা বেগম তার স্বামী ইমরান সাহেবের কাছ থেকে কয়েক দিন আগে জুতো কেনার জন্য চার হাজার টাকা নিয়ে রেখেছিলেন। এখনো সেটি কেনা হয়নি। টাকাগুলো হাতেই আছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘আমার চার হাজার টাকার জুতোর কী দরকার? এক হাজার টাকার জুতোতেই তো আমার সুন্দর চলে। কাজেই তিন হাজার টাকা আমি অনায়াসেই এই ব্যাংকে দান করতে পারি।’

রেহানা বেগম তিন হাজার টাকা আলমারি থেকে বের করে এনে ইমতিয়াজকে দেখিয়ে নিজের হাতে বিসমিল্লাহ বলে কাঠের ব্যাংকে ঢুকিয়ে দিলেন। মুখে বললেন, ‘আজ এই তিন হাজার টাকা দিয়ে তোমার ব্যাংক উদ্বোধন করলাম। এরপর থেকে আল্লাহ যখন যা তৌফিক দেবে তখন তা-ই তোমার এই ব্যাংকে দান করব। দোয়া করি আল্লাহ যেন তোমার এই মহতী কাজকে কবুল করেন।’

রেহানা বেগমের তিন হাজার টাকা ডোনেশনের কথা শুনে ইমরান সাহেব বললেন, ‘এই মাসে আমার একটি ব্লেজার বানানোর টার্গেট ছিল। ওটা আর বানাব না। কয়েকটি ব্লেজার তো আছেই। ওগুলো দিয়েই চলবে। কাজেই ব্লেজারের বাজেট কাট করে আমিও ১০ হাজার টাকা আমাদের ক্ষুদে সমাজসেবকের ব্যাংকে দেবো ইনশাআল্লাহ।’

তারপর ইমরান সাহেব তার ভাইবোনদেরকে এবং রেহানা বেগম তার ভাইবোনদেরকে বলে দিলো, ‘আমাদের ইমতিয়াজ একটি ত্রাণের ব্যাংক খুলেছে। তোমরা যখন যা পারো, যখন যা খুশি, এই ব্যাংকে টাকা পয়সা দিও।’

দিন যেতে থাকে। আত্মীয়স্বজন সবাই এই কাঠের ব্যাংকে কিছু কিছু ডোনেট করতে থাকে। ইমতিয়াজ তার হাত খরচ, টিফিন খরচ, যাতায়াত খরচ- সব বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে তার ব্যাংকে ঢুকায়। ইমতিয়াজের বাবা মা তাদের হাত খরচের যেখানে যতটুকু কমানো সম্ভব কমিয়ে ব্যাংকে ঢুকায়।

এভাবে বছর গড়িয়ে রোজার মাস এসে পড়ে। ইমরান সাহেব ছেলেকে বলেন, ‘তুমি কাকে কাকে সাহায্য করতে চাও তার একটি তালিকা তৈরি করে ফেলো। রোজা ২০-২২টা পার হতেই আমরা ব্যাংক খুলে ফেলব। তারপর টাকার পরিমাণ দেখে কাকে কী দেয়া যাবে সেই সিদ্ধান্ত নেবো।’

ইমতিয়াজ তার কয়েক বন্ধুকে সাথে নিয়ে মহল্লায় ঘুরে ঘুরে তালিকা তৈরি করে। এতে ৩৭ জন মেয়ে এবং ২৬ জন ছেলে মোট ৬৩ জনের নাম তালিকাভুক্ত হয়। এসব পোলাপানের কেউ কেউ দুগ্ধপোষ্য এবং কেউ কেউ প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণীতে পড়ে।

২০তম রোজার দিন কাঠের ব্যাংক খোলা হলো। টাকার পরিমাণ দেখে ইমতিয়াজের বাবা-মা দুজনেই অবাক। আরে বাপ রে বাপ! এত টাকা!

তারপর তারা দুজনে ইমতিয়াজকে সাথে নিয়ে টাকাগুলো গুছিয়ে গাছিয়ে গুণে দেখে ৬০ হাজার ৩৭০ টাকা হয়েছে।

ইমরান সাহেব ছেলেকে বলে, ‘আচ্ছা বাবা বলত, এই টাকা দিয়ে কী কী দেয়া যায়?’

ইমতিয়াজ বলে, ‘কাপড়চোপড় দেবো। এটা তো আগে থেকেই আমার ঠিক করা আছে আব্বু।’

ইমরান সাহেব বললেন, ‘এ ক্ষেত্রে একটু অসুবিধা আছে যে বাবা!’ ‘কী অসুবিধা আব্বু?’

‘তোমার তালিকায় ৬৩ জন পোলাপান। এই ৬৩ জনের কার কী ধরনের কাপড় দরকার, কার কী কালার পছন্দ, কার কাপড়ের মাপ কত- এসব জানা এবং সেই জানা মোতাবেক কেনাকাটা করা একটা ভীষণ কষ্টকর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে যে বাবা।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘তাই তো! তাহলে কী করা যায় আব্বু?’ ‘এক কাজ করি। তোমার কাঠের ব্যাংকে টাকা জমেছে ৬০ হাজার ৩৭০। আমি আমার পকেট থেকে আরো দুই হাজার ৬৩০ টাকা এই ফান্ডে জমা করি। তাহলে সর্বমোট টাকা হবে ৬৩ হাজার। তারপর আমরা এই টাকা ৬৩ জনের প্রত্যেককে এক হাজার করে নগদ দিয়ে দেই। তারা নিজেরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কাপড়চোপড় কিনুক। তাহলে আমাদেরও কষ্ট হবে না, বাচ্চারাও তাদের নিজেদের মাপ এবং পছন্দ মোতাবেক কাপড় কিনতে পেরে খুশি হবে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘ফাইন! এটাই ভালো হবে।’ ইমতিয়াজের মা রেহানা বেগমও এই প্রস্তাবে সায় দিলো। সবাই একমত হওয়ার পর, ইমতিয়াজ তার সাথীদেরকে নিয়ে নিজে বাড়িবাড়ি গিয়ে টাকাগুলো মহল্লার গরিব পোলাপানদের বাবা-মায়ের হাতে পৌঁছে দিলো। তারপর খালি ব্যাংকটার মুখ বন্ধ করে আবার পরের বছরের জন্য রেখে দেয়া হলো।