কম সার ব্যবহারে বেশি ফলনের নতুন সম্ভাবনা
ধান চাষে বাকৃবির উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির সাফল্য
Printed Edition
মো: লিখন ইসলাম বাকৃবি
দেশের কৃষিতে দীর্ঘ দিনের এক বড় চ্যালেঞ্জ ইউরিয়া সারের অপচয়। যার ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার বড় অংশই গাছের কাজে না লেগে বাতাসে উড়ে যায় বা মাটির নিচে লিচিং (শোষিত) হয়ে পানিদূষণ ও গ্রিন হাউজ গ্যাসের ঝুঁকি বাড়ায়। এমন প্রেক্ষাপটে আশার খবর নিয়ে এসেছে বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষকের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ইতোমধ্যেই সাফল্যের ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাঠে পরিচালিত পরীক্ষায় ধান চাষে এর কার্যকারিতা দেখা গেছে, যা কম সার ব্যবহারে বেশি ফলনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গবেষকদল জানান, এই গবেষণায় ইউরিয়া সারের কণাকে ন্যানো আকারে (প্রায় ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার) রূপান্তর করে বায়োচার দ্বারা আবৃত করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন মুক্ত করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে। ন্যানো-কার্বন কোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া অপচয় ও গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এর ফলে মাটির গুণাগুণ উন্নত হয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। উদ্ভাবিত এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও সমপরিমাণ বা অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ধানের ফলন ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ফসলের গুণগত মানোন্নয়নের সম্ভাবনাও লক্ষ্য করা গেছে।
এ বিষয়ে প্রধান গবেষক ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বলেন, ‘প্রতি বছর সরকারকে ইউরিয়া সারে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়। কৃষকেরাও সবচেয়ে বেশি এই ইউরিয়া সারই ব্যবহার করেন। যা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা দেখা দেয়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সারের খরচ কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে আমার গবেষণার কাজ শুরু করি। প্রাথমিকভাবে আমার যে অনুমান ছিল সেই অনুমানে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে আমরা সফল।’
তিনি আরো বলেন, ‘পরবর্তীতে আরো কিছু পরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে আমাদের এই ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তিটি কতটুকু সফল হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী যে আগামী মৌসুমেই আমরা এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারব। এটি যদি বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদন করা যায় এবং মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করা যায় তবেই এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ধান চাষের জন্য এই ন্যানো ইউরিয়া সার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট পিএইচডি ফেলো আমজাদ হোসেন বলেন, ন্যানো ইউরিয়া সিনথেসিস এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে আমরা সফল হয়েছি। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে আমরা প্রায় সাফল্যের পথে। যদি ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ফলন সমান থাকে তবুও আমরা সফল বলবো। কারণ প্রথাগত ইউরিয়া তিন বার দিতে হয় কিন্তু ন্যানো একবারে দিয়ে হবে। যেহেতু বায়োচার আকারে দিবে এতে কার্বন এমিশন কম হবে। মাটির গুণাগুণ বজায় থাকবে সমৃদ্ধি হবে। আর্থিকভাবেও কৃষক লাভবান হবে।’
মাটির কার্বন সমৃদ্ধের বিষয়ে ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘প্রথাগত ইউরিয়া ব্যবহারে গ্রিন হাউজ গ্যাস বিশেষ করে নাইট্রাস গ্যাস এমিশন বেশি হয়। এতে পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়ে। তবে যদি ইউরিয়াকে বায়োচর সমৃদ্ধ করে প্রয়োগ করা যাই তাহলে ২০-২২ শতাংশ কার্বন এমিশন কমানো যাবে। এতে মাটির কার্বন সমৃদ্ধ হয়ে উর্বরতা বৃদ্ধি করবে- এটা অনেক বড় অর্জন হবে।’
এবিষয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো: মনোয়ার করিম খান বলেন, এখানে ৮০ শতাংশ ন্যানো ইউরিয়া আর ১০০ শতাংশ প্রিলড ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যদি দুইটার ফলাফলকে আমরা পাশাপাশি রাখি তাহলে দেখতে পারব উভয়ই প্রায় একই রকম ফলন দিচ্ছে। যদি ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ ইউরিয়ার মতোই ফলন পাই তাহলে এটাকে প্রিলড ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারব এবং এটি কৃষকদের জন্যেও অনেক সাশ্রয়ী হবে। পাশাপশি সরকারের উপর কৃষি সারের বড় অংকের ভর্তুকি, গত বছরও যেটার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই চাপ হ্রাস পাবে।’
ব্রির গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা সূক্ষ্ম কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষণে দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ ইউরিয়া সার তিনবার এবং বিপুল পরিমাণে প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে ন্যানো ইউরিয়া মাত্র একবার ব্যবহার করেই আমরা কাক্সিক্ষত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছি। এতে আমাদের কৃষকদের শ্রম ও খরচ উভয়ই কমবে। সাধারণ ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে ধান ক্ষেতের মাটি থেকে যে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরিত হয়, ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই নিঃসরণ কমিয়ে আমরা একটি নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব।