স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী
ঐক্যবদ্ধ থাকলে অবশ্যই কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর দেশ গড়তে পারব
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে সহাবস্থানে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ঐক্যবদ্ধভাবে যদি দেশের জন্য কাজ করি, তাহলে অবশ্যই আমরা কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আলোচনা সভার শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহীদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আকাক্সক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ফারাক থাকলেও দেশের একজন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই, সবাই একসাথে দেশের জন্য কাজ করি, তাহলে অবশ্যই আমরা কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আসুন এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক, সমাজের একটি অংশ নয় বরং আমরা সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে এই দেশে আমরা ভালো থাকব। আমরা প্রত্যেকে একসাথে সহাবস্থানের মাধ্যমে খারাপকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করব, এই হোক আমাদের আজকের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার, প্রত্যাশা ও প্রতিজ্ঞা।
তারেক রহমান তার সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার আপনাদেরই সরকার, এ দেশের মানুষের নির্বাচিত সরকার। তাই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করছি। প্রতিনিয়ত তার জন্য আপনাদের এই সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির মহাসচিব তার বক্তব্যে বলেছেন শেষ পর্যন্ত তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা আমাদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। সুতরাং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরবগাথা তা নিয়ে আলোচনা হবে, গবেষণা চলবে এবং এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা গবেষণার নামে এমন কিছু করা বা বলা অবশ্যই আমাদের জন্য ঠিক হবে না যেটি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব ইতিহাস, তাকে কোনোভাবে খাটো করতে পারে।
তারেক রহমান বলেন, অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ থাকবে। আর অতীতকে যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে আমাদের দু’চোখ অন্ধ। সুতরাং আমরা যেমন অতীতকে একদম ভুলে যাব না, ভুলে যাওয়া চলবে না। ঠিক একইভাবে অতীতেও আমরা দেখেছি। খুব বেশিদিন না, নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি যে, অতীত নিয়ে এত বেশি চর্চা হয়েছে যেটা আমাদের সামনে যে সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ আছে, সেই ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনাদের বক্তব্যে অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। যা এই মঞ্চেসহ অথবা সামনে যারা বসে আছেন বাইরেও বহু মানুষ আজকের এই আলোচনা শুনছেন, অনেকেরই হয়তো অনেক কিছু জানা ছিল না। কিন্তু আলোচকবৃন্দের বক্তব্যে আজকে এইরকম অনেক বিষয় উঠে এসেছে। আজকে এখানে আসার সময় আমি দেখেছি তরুণ প্রজন্মের অনেক সদস্য ভেতরে আসতে পারেনি জায়গার সঙ্কুলান না হবার কারণে। সেই তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে খুব সংক্ষেপে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আমরা দেখেছি অতীতে শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদানকে, তার কাজকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর থেকেই প্রমাণিত হয়েছে তিনি অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অনিবার্য চরিত্র। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হঠাৎ করেই কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেননি। তিনি বলেন, শহীদ জিয়া প্রথম জীবনে অবশ্যই একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। তবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে স্বপ্ন, সেটি যে তার মনের মধ্যে সেই বোধশক্তির পথ থেকে লালন করতেন। এটি কিন্তু তার একটি লেখায় ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতার চিন্তাচেতনা তিনি ধারণ করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল সেটি আমরা তার একটি লেখা থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি। কথাগুলো আমার নয়, কথাগুলো কারো মনগড়াও নয়। এই কথাগুলো আমরা তার নিজের লেখনী থেকে জানতে পারছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদ জিয়ার নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ আছে যার শিরোনাম ‘একটি জাতির জন্ম’। প্রবন্ধটি যথেষ্ট বড়। আমি খুব সংক্ষেপে সেই প্রবন্ধের দুই একটি লাইন আপনাদের সামনে বলব। যেখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে পুরো বিষয়টি। এই প্রবন্ধের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি যে স্বাধীন বাংলাদেশ, সার্বভৌম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন। বহুদিন যাবৎ শহীদ জিয়া এটা লালন করছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রথম ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে ছাপা হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি বা নিবন্ধটির শেষ প্যারায় তিনি লিখেছিলেন, তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে বাঙালির হৃদয়ের লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে, এ দিনটিকে ভালোবাসবে। এই দিনটি তারা কোনোদিন ভুলবে না, কোনো দিন না, এভাবেই উনি লিখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটে কি হয়েছিল, আমি মনে করি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন এই তথ্যটি অবশ্যই তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়ার লেখা এই প্রবন্ধটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন কিন্তু মাত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তারা কিন্তু প্রত্যেকেই তখন বেঁচে ছিলেন। এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর কারো পক্ষ থেকেই আমরা কোনোরকম এমন কিছু আপত্তি বা এমন কিছু কথা পাইনি যা এই প্রবন্ধ বা লেখাটিকে কন্ট্রাডিক্ট করে। শহীদ জিয়ার এই প্রবন্ধটি যে শুধু ৭২ সালের ২৬ মার্চই প্রকাশিত ছিল তাও নয়। আবারো প্রকাশিত হয়েছিল সেটি আমি বলছি এবং সেই সময়টি বলার মাধ্যমে। এখানে আলোচকবৃন্দ কিছু কিছু বিষয় বলেছিলেন সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা বিতর্ক নিয়ে। পরে আমরা দেখেছি, শহীদ জিয়াকে খাটো করার জন্য বহু অপচেষ্টা হয়েছে। এখন আপনাদের যে তথ্যটি আমি দিব তার মাধ্যমে একদম সঠিক যুক্তি তর্কের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে শহীদ জিয়াকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আগেই আমি বলেছি যা সত্য তা সত্যই। শহীদ জিয়া যে মুক্তিযুদ্ধের একজন অনন্য চরিত্র এটিকে লুকানোর কোনোই উপায় নেই।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়ার নিবন্ধটি ১৯৭৪ সালে আবারো প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। তার লেখাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল। ৭৪ সালেও আবার যখন প্রকাশিত হয়েছিল কারোরই কোনো আপত্তি ছিল না এবং শহীদ জিয়া তার লেখায় যা যা বলেছিলেন তা অবিকল ছিল। সেই সময় সরকারে কারা ছিল, রাজনৈতিকভাবে কারা কোথায় অবস্থান করছিল আমাদের কমবেশি প্রত্যেকেরই ধারণা আছে। কিন্তু সেই সময় তৎকালীন সরকার অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউ শহীদ জিয়ার কোনো লেখার প্রবন্ধটির কোনো বক্তব্যকে কেউ কোনোভাবেই খণ্ডন করার করেননি, চেষ্টাও তারা করেননি। কারণ সেই সময় যারা ছিলেন তারা জানতেন শহীদ জিয়ার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ প্রবন্ধে উল্লেখিত সত্য সেগুলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ ধরেও বিশ্বের যেখানে যারা স্বাধীনতার লড়াই করেছেন সংগ্রাম করেছেন একমাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। আমরা যদি একটু পাশে তাকাই তাহলেই দেখতে পারব স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনের মানুষ। লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি। ২০২৪ সালে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির ভেতরে থেকেও বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও আপনারা কিভাবে প্রতিরোধ গড়েছিলেন, কিভাবে আপনারা স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তারেক রহমান বলেন, আমরা আমাদের বহু সহকর্মীকে সেদিন হারিয়েছি। প্রতিটি প্রাণের স্বপ্ন আছে, আকাক্সক্ষা আছে, স্বপ্ন ছিল আকাক্সক্ষাও ছিল। সেই আকাক্সক্ষা পূরণেই তারা সাহসের সাথে সেদিন লড়াই করেছিল ৭১, ৯০, ২৪ এ। ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত সকল প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের শহীদদের স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক তাঁবেদারমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সভায় আরো অংশ নেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
আজ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন তারেক রহমান
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন। গতকাল শুক্রবার বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শনিবার বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের আগমন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এরই মধ্যে কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে।
শায়রুল কবির খান জানান, আজ সন্ধ্যার পর প্রধানমন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসবেন। তিনি বেশকিছু সময় সেখানে থাকবেন। দলের চেযারম্যানের আগমন উপলক্ষে সিনিয়র নেতারাও এ সময় উপস্থিত থাকবেন।