নির্বাচন ঘিরে তৎপর পতিত আ’লীগের সহযোগীরা
Printed Edition
মনিরুল ইসলাম রোহান
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে পতিত আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলো। বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে উঠার পেছনে যে দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে অন্যতম ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন দল জাতীয় পার্টি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বৈধতার মহাসঙ্কটে ভুগছিল ঠিক তখনই আওয়ামী লীগকে উদ্ধারে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় ওই জাতীয় পার্টি। সেই জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোও আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে তৈরির কারিগর ছিল এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। ওই দলটি অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ার কারণেই মূলত পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেও রাষ্ট্র পরিচালনা করার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতনের পর তাদের সবপর্যায়ের নেতাকর্মী ও মন্ত্রিপরিষদ আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে অনেকেই প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশে পালিয়ে গেলেও তাদের সহযোগী দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব দেশের অভ্যন্তরেই ঘাপটি মেরে অবস্থান করে। এখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে আর তারা গর্ত থেকে বের হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের তোড়জোড় শুরু করেছে।
রাজনৈতিক সূত্র বলছে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করে। এরপরই ২০১১ সালে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি হাইকোর্টের এক রায়ে বাতিল হলে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট শুরু হয়। এ সঙ্কট সমাধান না করেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশগ্রহণ না করলে বৈধতার সঙ্কটে পড়ে আওয়ামী লীগ। ওই সঙ্কট থেকে উত্তোরণের জন্য এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিনাভোটে আসন ভাগাভাগির ওই নির্বাচনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের শরিক জেপিসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলো সরকারে মন্ত্রী-এমপি সবকিছুরই কমবেশি অংশীদারিত্ব পায়। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি পূরণ না হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু দিনের ভোট রাতে অনুষ্ঠানের অভিযোগে ভোট গ্রহণের মাঝপথে বর্জন করে বিএনপি-জামায়াত জোট। তারপরও আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলো একাট্টা হয়ে তাদের পূর্ণ সমর্থনে সরকার গঠন করে রাষ্ট্রপরিচালনা করে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনেও বিএনপি-জামায়াত তাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ওই নির্বাচন দেশে উপাধি পায় ‘আমি আর ডামি’র নির্বাচন হিসেবে। তখনো ওই বিতর্কিত নির্বাচনে একাট্টা হয়ে জাতীয় পার্টি, জেপি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলো পূর্ণ সমর্থন দিয়ে সরকার গঠন করে।
রাজনৈতিক সূত্র আরো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতনের পর আওয়ামী লীগ যখন রাজনীতি থেকে বিতাড়িত তখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টি কৌশলে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পুরো প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নির্বাচনী জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ গঠন করেছে। ওই জোটে আরো রয়েছে, বিএনএম, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, গণফ্রন্ট, মুসলিম লীগ ও তৃণমূল বিএনপি। যারা গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে একাট্টা হয়ে কাজ করেছে। ইতোমধ্যে নতুন এই জোট গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২২ আসনে ১৩২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিকে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত ওই জোটে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) বৃহত্তম সুন্নি জোটও আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন। অপর দিকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে নতুন করে ভিড়েছেন বহিষ্কৃত নেতা মসিউর রহমান রাঙা। তারাও এককভাবে ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। যদিও দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: ইসমাইল হোসেন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ত্রয়োদশ নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের দলের নিবন্ধন রয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ বিতাড়িত হওয়ার পর পরই তাদের দীর্ঘদিনের সহযোগীদের বিচার করা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- অন্তর্বর্তী সরকার সেটা করতে পারেনি। এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে। সেই নির্বাচনেও ফ্যাসিবাদের দোসররা অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়। এক প্রশ্নের জবাবে ড. মাসুম বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাপক চাপ রয়েছে। আমার ধারণা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই চাপ উপেক্ষা করতে পারছে না। বরং সরকারের নমনীয়নীতির কারণে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী ফ্যাসিবাদের দোসররা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে- এটা কখনোই কাম্য ছিল না। বিশেষ জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে বলে আমি মনে করি।