হা দি র জ ন্য প ঙ্ ক্তি মা লা
Printed Edition
মোশাররফ হোসেন খান
মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ
সমুদ্র ঈগলের মতো তিনি যখন দু’বাহু সম্প্রসারিত করেন
তখন স্পর্শ করে যায় সাতটি মহাদেশের প্রান্তসীমা।
হৃদয়ে তার দহন ও দ্রোহের লেলিহান।
দু’চোখে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ।
চলমান বিপ্লবের ব্যাকরণ ছিন্ন ভিন্ন করে
নিজেই হয়ে যান মহাবিপ্লবের নতুন ইতিহাস।
হয়ে যান আধিপত্যবাদবিরোধী এক মহানায়ক।
খুব স্বল্প সময়ের স্থিতি...
তারই ভেতর তিনি বইয়ে দিয়ে গেলেন...
মরু ঝড়, টাইফুন, সাইক্লোন
কী ভীষণ এক মহাপ্লাবন।
সাহসের উপমা তিনি... উত্তাল সমুদ্র।
সময়কে চার ভাঁজ করে ছুড়ে দেন ভবিষ্যতের দিকে।
দুর্বিনীত দুঃসাহসী জুলাই যোদ্ধা।
জুলাই যোদ্ধা থেকে মুহূর্তেই হয়ে গেলেন
বিরল এক মহাবিপ্লবী।
তার শাহাদাতে দশ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল গোটা বিশ্ব।
তার জানাজার দিন অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল পৃথিবী হাদিময় বাংলাদেশ।
মৃত্যুও যে এত মহিমান্বিত হতে পারে...
তাকে না দেখলে বুঝাই যেত না।
কখনো মনে হয় তিনি মরুসিংহ ওমর মোখতার
কখনো মনে হয় ইশা খাঁ, বখতিয়ার
সব কিছুর সমন্বয়ে তিনি...
ভাটি বাংলার একজন শহীদ বিপ্লবী তিতুমীর।
অনেকেই আসে, অনেকেই চলে যায়।
কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন...
যারা আসেন একবার
থেকে যান চিরকাল,
তরুণ তুর্কি ওসমান হাদি তাদেরই একজন
মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ...!
আরিফ মঈনুদ্দীন
বিশ কোটি মানুষের হৃদয়
এমন মৃত্যু কেউ কখনো দেখেনি
এমন ঝলমলে প্রস্থান যার ভাগ্যদুয়ার খুলে সুস্বাগত জানায়
তার জীবন তো নিছক জীবন নয়- এ এক কিংবদন্তি
এ এক অন্যরকম জাগরণ
প্রতিজন নির্যাতিত মানুষের রক্তে বান ডেকে যাওয়া সাইক্লোন
মাত্র সাড়ে-তিন-হাত বিশাল এক মহাসমুদ্র
স্বসৃষ্ট সুনামির টানে বয়ে যাওয়া বিপুল জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নেয়া
জালিমের প্রাসাদ, বাগানবাড়ি, বিলাসব্যসনের
আরো যত আঞ্জাম-আয়োজন
সব চামচা মোসাহেব পা-চাটা মানুষরূপী কুকুরের চেয়ে অধম
খড়কুটোর মতন ভেসে যাওয়া অপাঙ্ক্তেয় নির্লজ্জ
কিছু উচ্ছিষ্ট আদমসন্তান
সাঙাত সমভিব্যাহারে ভেসে গেছে পাশের সাগরে
বিপুল ¯্রােতের টানে দিশাহীন বেহায়া বদমাশরা
নিরাপদ আশ্রয় রচনা করেছে তথাকথিত প্রভুর আস্তানায়-
তারা যাকে মারতে চেয়েছে সে তো মরেনি-
মৃত্যু তাকে মহিমান্বিত করেছে- আগলে ধরেছে
পৃথিবীর মানুষের মাথার ওপর
যে বিপ্লব সে সূচনা করে দিয়ে গেছে তা আজ পৌঁছে গেছে
প্রতিজন মানুষের মর্মে
যে আপসহীন উচ্ছ্বাস সে রেখে গেছে তা-ই আজ যথেষ্ট
জালিমের জুলুমকে ভাসিয়ে নেয়ার
যে আবেগ সে রচনা করে গেছে তা-ই এই ছাপ্পান্ন হাজার
বর্গমাইলের দুর্জয় পাহাড়
আবেগ আর কান্নার মিশ্রণে যে দুর্দান্ত-দুর্দমনীয় শক্তি- তা-ই আজ
আগলে ধরেছে এই বদ্বীপকে
এমন এক মৃত্যু- যা পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছে- সন্ধান দিয়েছে
মুক্তির গুপ্ত দরোজার
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পরম প্রাপ্তির পথে
সমস্ত প্রতিবন্ধক কীভাবে উপড়ে ফেলতে হয়
সামান্য একটি জীবন কোন পরশপাথরের ছোঁয়ায় অসামান্য
অবিনাশী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে প্রতিটি মানুষের মনে
মৃত্যুর মহিমায় যে জীবন তা শুধু একজন হাদির নয়
উৎসাহে-উদ্যমে ফুলে ওঠা বুক- বিশ কোটি মানুষের হৃদয়।
গাউসুর রহমান
হাদি এক সংশপ্তক
হামাগুড়ি দিয়ে শোক নেমেছে প্রিয়, স্বদেশে
বাংলাদেশের চোখ এখন অশ্রুপুঞ্জ,
আমার ভাই বীর হাদিকে বিদ্ধ করেছে
ঘাতকের বুলেট।
হাদির মৃত্যুতে বাংলাদেশে নেমেছে
শোক-স্তব্ধতা। হাদি এক সংশপ্তক।
হাদি পেরেছিল মেঘের ভিতর বিদ্যুৎ জ্বালাতে,
সময়ের অনন্ত অঙ্গারে পাঠ করি আমরা
হাদি হারানোর অপার বেদনার পাণ্ডুলিপি।
ন্যায় ও সত্যকে হাদি তার রক্তে ছেঁকে নিয়েছিল,
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে
হাদি ছিল অকুতোভয়, আপসহীন।
হাদি জানত এ দেশের মানুষের
প্রাণের হিতাহিত। দেশের জন্য,
দেশের মানুষের জন্য,
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য-
হাদি দিয়েছে তার মৃত্যুহীন প্রাণ।
হাদি হারানোর অপার বেদনা-
বাংলাদেশের আকাশ ভরে তাই জ্বলে।
মুর্শিদ-উল-আলম
হাদি একজন শহীদ-নায়ক
সুভদ্র কিসের এত তাড়া ছিল
বত্রিশটা একুশে ফেব্রুয়ারি দেখেই চলে গেলে
২০২৫-এর ১৮ ডিসেম্বর দিনেই যেতে হলো
পূর্বে এদিনে তৈমুর লং দিল্লিকে দখলে নেয়
সুলতান মুহম্মদ তুঘলকের যে দিল্লি ছিল
আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির চৌকাঠে মুখাগ্নি করে
ছাইভস্ম দেখার সবুর হয়নি
পদ্মা মেঘনার ক্ষত উপশম না করেই চলে গেলে
কেন ওই টুকুন গতরে এত প্রতাপ জমিয়েছিলে
অনেকটা উঁচু কণ্ঠে ছিলে সিংহের প্রকট ধ্বনি
নির্গত প্রতিটি শব্দ শোয়াইব আক্তারের বল
বাংলাদেশ উচ্চারণ মাঠে
বিকৃত সংস্কৃতি দেখে দেখে ভেতরে এতটা ক্ষোভ জমে ছিল
সুভদ্র এভাবে হঠাৎ যেতে হলো
চুয়ান্ন বছর পর যমুনায় স্বচ্ছ স্রোত দিতে চেয়েছিলে
তোমার মগজের প্রতিটি কোষে কোষে কতটি এটমবোমা ছিল, ওরাও ঠিকই বুঝেছিল
ওরা ঘাতক, বুলেট ওদের ভাষা
কিভাবে তা ধূলিসাৎ করে দিতে শুরু করেছিলে
আরেকটু সময় দিলে কি এমন হতো!
আলতাফ হোসাইন রানা
বেদনার নীল কষ্ট
সফেদ সমুদ্রের সাহসী ঢেউয়ের মতো আর
নীল চাদোয়ায়, পড়বে না কবিতার কোলাহল
সুনীল আকাশের তারাগুলোয় লুকোচুরি খেলবে না
অতি চেনাজানা এক, তারা ঝলমল।
ফুল বিছানো প্রশস্ত বাগানে আজ,
নির্বাক চেয়ে আছে
শ্যামল মাঠের চারিদিক
যেখানে তার শস্যের দানাগুলো চিরকাল
ফসল ফলাবে- ঠিক।
কি অতৃপ্ত আকাক্সক্ষায় নীলাভ চাদরে ঢেকে,
আপাদমস্তক তার স্বপ্নেরা বিনিদ্র কাটায় রাত।
কি দুঃখের মেহগনি খাটে-শয্যাপাতা,
জানি না কিছুই শুধু জানি অন্তহীন রহস্যের
নীল পর্দার আড়ালে রয়েছে তার নিজস্ব পরিচয় সহজাত।
তার সীমানা এখন মৃত্যুর ওপারে বিশ্বস্ত ঠিকানায়
মৃত্যু আর তাকে কখনো ছোঁবে না
এখন মৃত্যু শুধু আমাদের নিরন্তর
বেদনার নীল কষ্টকে দেবে হানা।
নূরুন্নাহার নীরু
হাদির পরিচয়
মায়ের চোখের রাজপুত্তুর
স্ত্রীর জন্য বীরপুরুষ
সন্তানের কাছে সোহাগভরা কোমল আশ্রয়
এই তো হাদির পরিচয়!
আর জাতির কাছে?
জাতির জন্য অনন্তকালের বিপ্লবী পথিকৃৎ
যে শুধুই আপসহীন, যে শুধুই স্পষ্টভাষী-
শুধুই প্রতিবাদী, সেই তো হাদি।
হাদি মানেই বিশাল ঝঞ্ঝা! গভীর গর্জন,
প্রচণ্ড টর্নেডো! উড়ন্ত আইলা!
হাদি মানেই শক্তি- শক্তির হিমালয়!
হে প্রজন্ম জেনে রাখ- এটিই হাদির পরিচয়?
শাহীন আরা আনওয়ারী
হাদি আমার প্রিয় হাদি
হাদি মিশে আছে
বাংলার হৃদয়ে
চেতনার অলিগলিতে!
তাই তো তিল ধারণের
ঠাঁই নেই, নেই রাজপথে
মিছিলে কাঁপছে দেশ
লাখো কোটি হাদি জেগেছে
জেগেছে বাংলাদেশ।