জেরার সময় প্রসিকিউশনের আপত্তিতে বিচারকের মন্তব্য
সময়ক্ষেপণ ছাড়া ওনার আর কী করার আছে?
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও নির্যাতনের মামলায় জেরা চলাকালে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীর অবান্তর প্রশ্নের মুখে প্রসিকিউশন টিমের জোরালো আপত্তি থাকলেও, খোদ বিচারকের পাল্টা মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে প্রসিকিউটরদের বর্তমান অবস্থান ও অসহায়ত্বই ফুটে উঠেছে।
গতকাল সোমবার জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের শিকার ইকবাল চৌধুরীর সাক্ষ্য গ্রহণ পরবর্তী জেরা চলছিল। আসামিপক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকীর আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে এমন সব প্রশ্ন করতে থাকেন, যা মামলার মূল প্রসঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যহীন বলে মনে হয়। আইনজীবী প্রশ্ন করেন, যে রুমে ইকবাল চৌধুরীকে রাখা হয়েছিল সেখানকার ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সজস্ট ফ্যানটি’ লোহা নাকি পিতলের তৈরি? কিংবা সেটির ব্লেড ‘গ্যালভানাইজড’ ছিল কি না?
আসামিপক্ষের আইনজীবীর এমন ‘অপ্রাসঙ্গিক’ প্রশ্নের সময় প্রসিকিউশন টিম থেকে গাজী এম এইচ তামীম দাঁড়িয়ে তীব্র আপত্তি জানান। তিনি আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, এগুলো নিছক সময়ক্ষেপণ। এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের আইনি বাধা-নিষেধও তিনি আদালতের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তবে প্রসিকিউটর তামীমকে কার্যত ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তিনি প্রসিকিউশনকে বসিয়ে দিয়ে অনেকটা বিদ্রƒপের সুরেই মন্তব্য করেন ‘সময়ক্ষেপণ ছাড়া উনার (আসামিপক্ষের আইনজীবী) আর কী করার আছে? আপনি বসেন।’
আদালত কক্ষের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, বিচারকের এই মন্তব্যে একধরনের অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে প্রসিকিউশন টিমের মধ্যে। যেখানে প্রসিকিউশন আশা করেছিল আদালত অবান্তর প্রশ্নগুলো আটকে দেবেন, সেখানে বিচারকের এমন মন্তব্য পরোক্ষভাবে আসামিপক্ষকে সময়ক্ষেপণেরই সুযোগ করে দিচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। আইনি লড়াইয়ে প্রসিকিউটরদের জোরালো যুক্তি থাকলেও বিচারকের এমন অবস্থানে তারা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বিচারকের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে আইনজীবী দুলু পুনরায় একই ধরনের প্রশ্ন চালিয়ে যান। এর জবাবে ভুক্তভোগী ইকবাল চৌধুরী জানান, ফ্যানটি ধাতব পদার্থের ছিল ঠিকই, তবে সেটি লোহা না পিতল তা তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এমনকি সেটির ব্লেড গ্যালভানাইজড ছিল কি না তাও তিনি জানেন না। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের করিডোরে উপস্থিত অনেকে মন্তব্য করেন, শেখ হাসিনাসহ হাই-প্রোফাইল আসামিদের এই স্পর্শকাতর মামলায় প্রসিকিউশন টিম যে ধরনের আইনি দাপট দেখানোর কথা ছিল, আদালতের ভেতরে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বরং অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন।
এই সাক্ষীর পরবর্তী জেরার জন্য আগামী ১ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০১৮ সালে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে গুমের শিকার হওয়া ইকবাল চৌধুরীর এই মামলায় প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও গ্রেফতার থাকা তিন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকীকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। মামলায় তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ আরো ১০ জন পলাতক রয়েছেন।
পলাতক ১০ আসামির মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা হলেন- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।
এ ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক।