মায়া চরে ভয়ঙ্কর চোরাবালি লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ

এই চরে এলে নাকি সবাই মায়ায় পড়ে যান। তাই এই চরের নাম দেয়া হয়েছে মায়া চর। কথা ঠিকই লম্বাকৃতির ছোট আয়তনের এই মায়া চরে গেলে যে কোনো পর্যটক মায়ায় পড়ে যাবেন।

Printed Edition
back-2
মায়া চরে ভয়ঙ্কর চোরাবালি লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ

রফিকুল হায়দার ফরহাদ মায়া চর (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে

‘ভাই সামনে কি আর কোনো চর আছে’। চর তুফানিয়া থেকে বের হয়ে সাগরে মাছ ধরতে থাকা একটি ট্রলারের মাঝিকে এই প্রশ্ন। কারণ আমাদের মিশন ছিল চর তুফানিয়া থেকে রূপার চর যাওয়ার সময় মাঝে যে কয়টি নতুন চর তথা দ্বীপ পাবো সেগুলোতে যাওয়া। পাশের সেই মাঝি বললেন, চর তুফানিয়ার দক্ষিণ পূর্বে মায়া চর পাবেন। এরপর আর কোনো চর নেই এই অংশে। তবে চর তুফানিয়ার বরাবর দক্ষিণ পশ্চিমে সাগরের আরো ভেতরে আরেকটি চর আছে। চর তুফানিয়া থেকে অনেক সময় লাগবে সেখানে যেতে। ৬/৭ ঘণ্টা বা আরো বেশি। আমরা অবশ্য সে পথে না এগিয়ে কাছাকাছি দূরত্বের মায়া চরের উদ্দেশেই রওনা হলাম। আমরা তিনজন। আমি আমাদের নয়া দিগন্তের রাঙ্গাবালী প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম ও তার ভাই শহীদুল হাওলাদার। কারো পক্ষে দূরের দ্বীপ বা চর শনাক্ত করা কঠিন। যে কারণে অন্যদের জিজ্ঞাসা করেই এগোতে হচ্ছিল।

অন্য মাঝির কাছ থেকে তথ্য পেয়ে আমাদের ট্রলার ছুটল মায়া চরের উদ্দেশে। ৪৫ মিনিটের মতো বঙ্গোপসাগরের বুকে ট্রলার চালিয়ে যাওয়ার পর দেখা মিলল মায়া চরের। খুব বেশি দিন হয়নি এই চর জেগে উঠার বয়স। আশপাশে কাউকে পেলামও না এই চর সম্পর্কে তথ্য জানতে। ট্রলার যতই দ্বীপটির কাছে পৌঁছাল ততই স্পষ্ট হচ্ছিল এর সৌন্দর্য। দেড়-দুই কিলোমিটারের মতো এই মায়া চরের আয়তন। তখন ভাটা চলছিল। তাই এই আয়তনের চরই আমাদের দৃশ্যমান হলো। জোয়ারের সময় আরো অল্প জায়গাই পানির ওপরে থাকে।

দূর থেকেই মায়া চরে পাখির উপস্থিতি চোখে পড়ছিল। আমাদের ট্রলার কাছাকাছি পৌঁছানোর সাথে সাথেই বিশাল বিশাল সামুদ্রিক পাখিগুলো উড়ে আরো দক্ষিণে চলে গেল। ট্রলার তীরে ভেড়ার পর লাফিয়ে নামতে হলো সাগর পাড়ে। ততক্ষণে হাঁটুপানি পর্যন্ত ভিজে গেছে। মাঝি শহীদুল আমাদের তাড়াতাড়ি নামার তাগিদ দিলেন। তা না হলে সমস্যা হবে। ট্রলারও চলে যাবে দূরে। যাই হোক শহীদুল ভাইকে ট্রলারে রেখে আমরা দুইজন নেমে গেলাম মায়া চরে। সাগরের পাড় থেকে ৮-১০ ফুট পর্যন্ত যেতে কোনো সমস্যাই চোখে পড়ল না। তবে এরপর সামনে এগোতেই প্রতি কদমে বালুতে দেবে যাচ্ছিল পা। গোড়ালি পর্যন্ত বালুর নিচে পা চলে যাচ্ছিল। মানে এই অংশে চোরাবালি। তাই রফিকুল ইসলাম বারবারই সতর্ক করছিল এই চোরাবালির বিষয়ে। আরো বেশি পা দেবে গেলে জীবন নিয়ে ফেরাটাই কঠিন হয়ে যাবে। আমরা বালুর ওপর দিয়ে এপার থেকে ওপার পর্যন্ত এই চোরবালির ওপর দিয়েই পার হয়েছি। তবে পশ্চিম দিকে সাগর পাড়ে আর চোরাবালি পাওয়া যায়নি। চোরাবালির ভয় এবং হাতেও সময় কম থাকায় চরটির একেবারে দক্ষিণে আর যাইনি। তবে চরটির পূর্ব দিকের তুলনায় পশ্চিম দিকের সাগর পার অপেক্ষাকৃত সমান। অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে গেলেও কোমর পর্যন্ত শুকনা থাকবে। ওই পশ্চিম পাড়ে জেলেদের পোঁতা দু’টি মরা গাছ দেখলাম। জাল পাতার জন্যই এই মরা গাছকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে একটি ছেঁড়া জালও লেগে আছে।

মায়া চর লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। ট্রলার থেকেই দেখছিলাম গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে ছোটাছুটি করা লাল কাঁকড়ার ঝাঁক। স্বভাব সুলভ আমাদের দেখেই গর্তে লুকিয়ে যায়। আমরা চরে নেমেই সেই লাল কাঁকড়ার পিছু নিলাম। গভীরভাবে চোখ রাখতে হতো কোন গর্তে তারা ঢুকছে নিরাপত্তার জন্য। কারণ আশেপাশে অনেক গর্ত থাকে। এভাবেই দুই গর্ত খুঁড়ে বের করা হলো দু’টি লাল কাঁকড়া। বেশ সাবধানতা অবলম্বন করেই এই কাজ। তা না হলে আঙুল কেটে রক্তাক্ত করে দেবে। যা ২০২২ সালে চর তুফানিয়ায় হয়েছিল। লাল কাঁকড়া দুটোকে গর্ত থেকে বের করে আবার ছেড়ে দেয়া হলো। তারাও ছুটে পালিয়ে আরেক গর্তে ঢুকে পড়ল। কোনো গাছপালা নেই এই মায়া চরে। ছোট কোনো ঘাসও নেই। হয়তো আরো কয়েক বছর পর এই চরে গাছ গজানো এবং সেগুলো টিকে থাকার মতো অনুকূল পরিবেশ হবে।

পাখির পায়ের ছাপ ছিল পুরো চর জুড়েই। জোয়ারের সময় এই চরের যে অংশ পানির নিচে ডুবে যায় সেখানে মাছ আসে। সাথে শামুক, ঝিনুকসহ নানা সামুদ্রিক ছোট প্রাণী। সেই মাছ খাওয়ার জন্যই পাখিরা আসে। আর জেলেরা সেই পানিতে জাল পেতে মাছ ধরে। কিছু কালারফুল মরা শামুক আমরা কুড়িয়ে নিলাম। বেশ কিছু মরা জেলি ফিশ পাওয়া গেল মায়া চরে। জোয়ারের সময় আসার পর আর চলে যেতে পারেনি। বালুতে আটকে মরে গেছে। আবার আমরা যখন ট্রলারে করে চলে আসছিলাম তখনও দেখলাম একটি জেলি ফিশ পানিতে সাঁতরে চলে যাচ্ছে।

এই মায়া চর হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। কিছু পর্যটক প্রতি শীতেই যান চর তুফানিয়ায়। তাদেরকে যদি মায়া চরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয় তাহলে অবশ্যই তারা যাবেন। কারণ দূরত্ব যেমন কম তেমনি দেখতেও সুন্দর। অবশ্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন বা জেলা প্রশাসন মায়া চর বা চর তুফানিয়ায় পর্যটকদের জন্য কোনো কিছুই করেনি। ফলে পর্যটক বহনকারী ট্রলারের মাঝিরা যার কাছ থেকে যেভাবে পারেন টাকা নেন। অথচ কুয়াকাটার দক্ষিণ পূর্বে চর বিজয়ে পর্যটকদের নেয়ার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। সেখানে টাকা নেয়ার পরিমাণও নির্দিষ্ট। মায়া চরের অবস্থান চর তুফানিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে হলেও সোনার চরের বরাবর দক্ষিণে। আমরা ফেরার সময় সোনার চর হয়েই এসেছি।

কেন এই চরের নাম মায়া চর? জেলেদের মতে, এই চরে এলে নাকি সবাই মায়ায় পড়ে যান। তাই এই চরের নাম দেয়া হয়েছে মায়া চর। কথা ঠিকই লম্বাকৃতির ছোট আয়তনের এই মায়া চরে গেলে যে কোনো পর্যটক মায়ায় পড়ে যাবেন।

মায়া চরে আমরা যে চোরাবালির মুখে পড়েছিলাম সেই চোরাবালি পেয়েছিলাম কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপেও। শুঁটকি পল্লী ঘাট দিয়ে বোটে করে সরাসরি পশ্চিমে সোনাদিয়া দ্বীপের পাড়ে নামতে গেলেই এই চোরাবালি পার হতে হবে।