ছেলের লাশ দেখার আগেও পুলিশ বাধা দিয়েছিল

ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদের বাবার জবানবন্দী

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
ICT

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া আবু সাঈদের মৃত্যুর পর লাশ দেখার আগেও পুলিশ বাধা দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এমন অভিযোগ করেছেন তার বাবা মকবুল হোসেন। ছেলের হত্যার বিচার জীবিত থাকতে দেখে যেতে চান বলেও জানান তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে মকবুল হোসেনের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন তিনি ছাড়াও রংপুরে কর্মরত এনটিভির সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এর মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সাইমুম রেজা তালুকদারসহ অন্যরা।

এদিন বেলা ১১টায় এ মামলার ছয় আসামিকে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।

বেলা ১১টা ২২ মিনিটে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন মকবুল হোসেন। ঠিক ২ মিনিট পর তিনি শপথ পাঠ করে সাক্ষ্য দেয়া শুরু করেন। শুরুতেই নিজের পরিচয় দেন মকবুল হোসেন। বলেন, ‘আমি শহীদ আবু সাঈদের বাবা। ১৬ জুলাই আন্দোলনে তিনি শহীদ হন।’ জবানবন্দীতে মকবুল বলেন, ‘আমার ছেলে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে রংপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হয়। ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিল। টিউশনি করেই নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতো।’

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ফসলের মাঠ থেকে দুপুর ১২টায় বাড়ি ফেরেন মকবুল হোসেন। ফিরতেই দেখেন সবাই কান্নাকাটি করছেন। কিছুক্ষণ পর শোনেন আবু সাঈদ মারা গেছেন।

সাক্ষী বলেন, ‘ছেলের মৃত্যুর খবর শুনেই আমার মাথায় যেন আসমান ভেঙে পড়ে। তাৎক্ষণিক খবর নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ছেলে ও মেয়ের জামাইকে পাঠাই। তারা গিয়ে দেখেন আবু সাঈদের লাশ নেই। লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে গেছে। এরপর তারা রংপুর মেডিক্যালে যান। প্রথমে লাশ দেখতে চাইলে পুলিশ দেখতে দেয়নি। একপর্যায়ে ছেলে-জামাইয়ের চাপে দেখতে দেয়া হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে আবু সাঈদের লাশ বাড়িতে আনা হয়। তবে প্রশাসনের লোকজন রাতেই দাফন করতে বলেন। কিন্তু আমরা রাজি না হয়ে পরদিন সকাল ৯টায় দু’বার নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি। লাশ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় দেখি তার মাথায় রক্ত ঝরছে। বুকে গুলির চিহ্ন। সারা বুক দিয়ে রক্ত ঝরছে। পরে শুনতে পাই আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র।’

জবানবন্দীতে মকবুল হোসেন বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে আবু সাঈদকে গলা টিপে ধরাসহ চড়-থাপ্পড় মারেন ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ) নেতা পমেল বড়ুয়া। আমার আশা ছিল, ছেলেটা চাকরি করবে। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূর্ণ হলো না। যেহেতু আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। তাই আমি আশা করব, আমার মৃত্যুর আগে যেন ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি। এ ছাড়া আমার ছেলেকে নির্মমভাবে যারা শহীদ করেছে তাদের বিচার চাই। ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ)-যুবলীগ নেতাদেরও বিচার চাই।’

মকবুল হোসেনের জবানবন্দীর পর তাকে জেরা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ মামলার আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামের আইনজীবী আমিনুল গণী। তিনি মকবুল হোসেনকে জেরা করে বলেন, আবু সাঈদ হত্যার পর আপনার ছেলে রমজান আলী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা করেছেন। তখন প্রসিকিউটর মো: মিজানুল ইসলাম বলেন, মকবুল হোসেন এ কমপ্লেন (মামলা) করেননি। আইন অনুযায়ী আপনি তাকে এই জেরা করতে পারেন কি না? জবাবে আমিনুল গণী বলেন, তার ছেলে মামলা করেছেন, এটা উনি জানেন কি না, এটা তার প্রশ্ন। সে সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে বলা আছে, কোনো কন্ট্রাডিকশন নেয়া যাবে না। অর্থাৎ আপনি ক্রেডিবিলিটি (বিশ্বাসযোগ্যতা) নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন তবে কন্ট্র্রাডিকশন (বিরোধিতা) করতে পারবেন না। একপর্যায়ে জেরা ডিক্লাইন (জেরা না করা) করেন আমিনুল গণী।

এরপর আসামি পমেল বড়ুয়ার পক্ষে মকবুল হোসেনকে জেরা করেন আইনজীবী মাহবুবুর রশীদ। তিনি বলেন, আপনার কয় ছেলেমেয়ে? জবাবে আবু সাঈদের বাবা বলেন, আমার ছয় ছেলে তিন মেয়ে। আবু সাঈদ ৬ নম্বর ছেলে। তখন আইনজীবী বলেন, আপনার ছেলে কত সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল? সাঈদ কোন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল জানি না। কারণ আমি লেখাপড়া জানি না। তখন আইনজীবী পাল্টা প্রশ্ন করেন পামেল বড়ুয়া আপনার ছেলেকে কয় তারিখে থাপ্পড় দিয়েছিল? মকবুল হোসেন বলেন, ওই তারিখ আমি বলতে পারব না। তবে মৃত্যুর তিন-চারদিন আগে। পরে আইনজীবী জানতে চান আবু সাঈদ কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল কি না। আবু সাঈদের বাবা তখন বলেন, নাহ, আমার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইহা সত্য নয় যে, পমেল বড়ুয়া সম্পর্কে যা বলেছি তা মিথ্যা, মনগড়া এবং বানোয়াট।

এরপর অন্য আসামিদের পক্ষে আবু সাঈদের বাবাকে জেরা করেন অন্য আইজীবীরা।

এর আগে ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গত ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে ফর্মাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে এ মামলায় বেরোবির সাবেক ভিসিসহ ২৪ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের পক্ষে গত ২২ জুলাই সরকারি খরচে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়।

২৮ জুলাই এ মামলার ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। ওই দিন আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি এ মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগসহ বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়া হয় ৩০ জুন। আর ২৪ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। এ মামলায় মোট সাক্ষী ৬২ জন।